সংবিধানসম্মত সমাধান খুঁজছে জাতিসংঘ

0
12
Print Friendly, PDF & Email

সংবিধানের আলোকে সব দলের অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সমাধান খুঁজতে চেষ্টা করছেন বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সচিব, ঢাকার কূটনীতিক ও আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলকে জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি-মুনের বিশেষ দূত অস্কার ফারনান্দেজ তারানকো। গতকাল সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জাতিসংঘের আরও চার কর্মকর্তাকে নিয়ে কমপক্ষে আটটি বৈঠক করেছেন তারানকো। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে বৈঠক ও বান কি-মুনের বিশেষ বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন তারানকো। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচন পেছানোর অনুরোধ জানান। তবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এটি সম্পূর্ণই নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার। অন্যদিকে, বিরোধীদলীয় নেতাকে জাতিসংঘের দূত তারানকো বলেছেন, নির্বাচনের জন্য প্রধান দুই দলের ঐকমত্য চায় জাতিসংঘ। তবে এ জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে বলেছেন বিরোধীদলীয় নেতা।
সকালে ঢাকায় জার্মানির রাষ্ট্রদূত আলব্রেখট কনজের বাসায় আয়োজিত প্রাতঃরাশ বৈঠকের মাধ্যমেই দিনের কর্মসূচি শুরু করেন অস্কার ফারনান্দেজ তারানকো। সে বৈঠকে ছিলেন ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন, কানাডার হাইকমিশনার হিদার ক্রুডেন, চীনা রাষ্ট্রদূত লি জুন ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের প্রধান উইলিয়াম হানা। কূটনৈতিক সূত্রের খবর, সকালে রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে তাদের পর্যবেক্ষণ জানতে চেয়েছেন তারানকো। পর্যবেক্ষণ উপস্থাপনের পাশাপাশি তারানকোর সফরের প্রতি সমর্থন ও পরামর্শগুলো উপস্থাপন করেন কূটনীতিকরা। নিজেদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথাও জানিয়েছেন তারানকোর কাছে। জবাবে তারানকো ‘সফরেই আবারও বিভিন্ন সময়ে কূটনীতিকদের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রয়োজন হবে’ বলেও মন্তব্য করেন।
পরে সকাল ১০টায় তারানকো যান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হকের সঙ্গে ৪৫ মিনিট আলোচনা করেন তারানকো ও তার নেতৃত্বে থাকা পাঁচ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা। পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গেও ৪৫ মিনিট সময় নিয়ে বৈঠক করেন জাতিসংঘ প্রতিনিধিরা। তারানকোর সঙ্গে প্রতিনিধি দলে আছেন নিউইয়র্ক থেকে আসা জাতিসংঘের নির্বাচন সহায়তা বিভাগের পরিচালক ক্রেইগ জেনিস, মধ্যস্থতা বিশেষজ্ঞ লিভেন্ট বিলম্যান ও রাজনীতি বিভাগের দুই কর্মকর্তা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ও ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী নিল ওয়াকার মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোয় উপস্থিত ছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুনকে উদ্ধৃত করে তারানকো বলেছেন, ‘সময় খুবই সীমিত’। নির্বাচনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও উল্লেখ করেছেন তারানকো। নির্বাচনের ক্ষেত্রে এক. সঙ্ঘাতবিহীন শান্তিপূর্ণ দুই. সবার অংশগ্রহণ এবং তিন. গ্রহণযোগ্যতা অপরিহার্যতার কথা বলেছেন। এ জন্য বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানের মধ্যেই একটি সমাধান দ্রুত খোঁজার বিষয়েই বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন তারানকো। সূত্র জানায়, জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা বলেছেন, তারা চান সবার অংশগ্রহণে বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। এ পরিবেশের জন্য সংলাপ দরকার। সংলাপের জন্য সব ধরনের উদ্যোগের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। চলমান পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ উদ্বিগ্ন বলেও তিনি জানান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বেরিয়ে হোটেল সোনারগাঁওয়ে রাষ্ট্রদূত ড্যান ডবি্লউ মোজেনার সঙ্গে আধা ঘণ্টার বৈঠক করেন তারানকো। পরে দেড়টার দিকে হোটেলে আওয়ামী লীগের সাত সদস্যের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। প্রায় দেড় ঘণ্টার এ বৈঠকে সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনের জন্য সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও নির্বাচন প্রস্তুতির কথা তারানকোর কাছে তুলে ধরেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, গওহর রিজভী, ফারুক খান, মাহবুব-উল আলম হানিফ, শাহেদ রেজা। বৈঠক সূত্র জানায়, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কী করা উচিত সে সম্পর্কে তারানকো তার বক্তব্য তুলে ধরেছেন। এর বিপরীতে আওয়ামী লীগও তাদের অবস্থান তুলে ধরেছে। তবে এ বৈঠকে তারানকোর পক্ষ থেকে কোনো প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে কি না সে বিষয়ে কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানায় সূত্রটি। অবশ্য বৈঠক শেষে সৈয়দ আশরাফ সাংবাদিকদের বলেন, ‘জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগের বিষয়ে আমরা অত্যন্ত আশাবাদী। আলোচনা শুরু হয়েছে। তার সফরকালে আরও কয়েক দফা আলোচনা হবে। আশা করি সবাইকে নিয়ে প্রত্যাশিত একটি নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হবে।’ তিনি বলেন, ‘গত নির্বাচনের আগে জাতিসংঘ উদ্যোগ নিয়েছিল। সে সময় বান কি-মুন নিজে এসেছিলেন। এ কারণেই তখন নির্বাচন সুষ্ঠু ও সফল হয়েছিল। এবারও তারানকোসহ জাতিসংঘ প্রতিনিধি দল উদ্যোগী হয়ে এসেছেন। আলোচনা হবে।’ সব দলের অংশগ্রহণবিষয়ক প্রশ্নের জবাবে আশরাফ বলেন, ‘যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে তাদের সবাইকে নিয়ে নির্বাচন হবে। কিছু দল নির্বাচন থেকে দূরে রয়েছে, তাদের বিষয়ে বলার কিছু নেই।’
পরে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠক করেন জাতিসংঘ প্রতিনিধিরা। প্রথমে ৪০ মিনিট বৈঠক করেন সবার উপস্থিতিতে, পরে এক ঘণ্টা বৈঠক করেন একান্তে শেখ হাসিনা ও তারানকো। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা গওহর রিজভী জানিয়েছেন, বৈঠকে তারানকোর পক্ষ থেকে নির্বাচন পেছানোর দাবি করা করা হয়। জবাবে প্রধানমন্ত্রী এর এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের বলে মন্তব্য করেন। গওহর রিজভী বলেন, তারানকো জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ বার্তা নিয়ে এসেছেন। জাতিসংঘ মনে করে বাংলাদেশ উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার উদাহরণ। তারা চায় বাংলাদেশ যেন সেই অবস্থান ধরে রাখে। বৈঠকের এক পর্যায়ে আসন্ন জাতীয় সংসদের বিষয়টি উঠে এসেছে উল্লেখ করে গওহর রিজভী বলেন, জাতিসংঘের মহাসচিব তার বার্তায় বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হতে পারে। কেয়ারটেকার সরকার নিয়ে আলোচনার দরকার নেই। কিন্তু নির্বাচনে সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকতে হবে। শেখ হাসিনা তারানকোকে বলেছেন, সরকার নির্বাচনের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না। এ ব্যাপারে কোনো কথা থাকলে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বলতে হবে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারানকোকে জানিয়েছেন নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তিনি নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগকে তারানকো স্বাগত জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারানকোকে আরও জানান, সবার সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। এ কমিশন এরই মধ্যে সিটি নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। তাতে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ আসেনি।
পরে সোনারগাঁও হোটেলে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা তারানকোর প্রাথমিক সূচিতে ছিল। সেখানে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অন্য নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকের কথা ছিল এই জাতিসংঘ দূতের। কিন্তু পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি। সরাসরি বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন তারানকো। বৈঠকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান, সাবিহ উদ্দিন আহমেদ ও সহ-সভাপতি শমসের মবিন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। দেড় ঘণ্টার আনুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে বেগম খালেদা জিয়া ও তারানকো একান্তে ৪৫ মিনিট কথা বলেন। বৈঠকের পর শমসের মবিন চৌধুরী এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেও বিস্তারিত জানাতে চাননি। তবে তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন সরকারসহ চলমান রাজনীতি নিয়ে কথা হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরেছেন। আগামীকাল (সোমবার) সন্ধ্যা ৬টায় বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে আবারও বৈঠক করবেন তারানকো। এর পরই বৈঠকের বিস্তারিত জানানো হবে।
ব্যস্ত সফরসূচির মধ্যে তারানকো আজ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিরোধীদলীয় নেতার উপদেষ্টা, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। গতকাল ও আজকের আলোচনায় কোনো ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থান খুঁজে পেলে একে ভিত্তি করেই অগ্রসর হবেন অস্কার ফারনান্দেজ তারানকো। সফরের শেষে আগামীকাল বিকাল ও সন্ধ্যায় আবারও বৈঠক করবেন দুই নেত্রীর সঙ্গে। সর্বাত্দক চেষ্টা চালাবেন সমঝোতার। আগামী রাতেই নিজের সফরের সব বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন জাতিসংঘের এই দূত। মঙ্গলবার সকালে ঢাকা ত্যাগ করবেন তারা।
তারানকোর সঙ্গে বেগম জিয়ার বৈঠকের পর বেরিয়ে এসে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জাতিসংঘের বিশেষ দূতের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ সম্পর্কে তারানকো জানতে চাইলে বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, আমরা সংকট সমাধানে আলোচনার জন্য বার বার আহ্বান জানিয়েছি। এমনকি জাতিসংঘ মহাসচিব ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চিঠির জবাব দেওয়া হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি ও ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদককে সংলাপের উদ্যোগ নিতে লিখিত চিঠি দেওয়া হয়েছে। এখন যা করার সরকারকেই করতে হবে।

Facebook Comments