সহিংস রাজনীতির আগুনে পুড়ছে অর্থনীতি

0
9
Print Friendly, PDF & Email

চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার আগুনে পুড়ছে দেশের অর্থনীতি। ঘুরছে না কলকারখানার চাকা। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা। ভেঙে পড়েছে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা। ব্যাংক খাতও আক্রান্ত সহিংসতার আগুনে। এক শাখা থেকে আরেক শাখা ঘুরে টাকা উঠাতে পারছেন না গ্রাহক। বুথ থেকে বুথ ঘুরেও সমাধান হচ্ছে না। আমদানি-রপ্তানির এলসি খোলা প্রায় পুরোপুরিই বন্ধ। শুক্রবার ব্যাংক খোলা রেখেও গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে পারছে না ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক ডেকেছেন অর্থমন্ত্রী। এদিকে বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্থবির। থমকে দাঁড়িয়েছে সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। ভাটা পড়েছে কর্মসংস্থানে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ প্রায় সব উন্নয়ন সহযোগীই বলছে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে না। মুখ থুবড়ে পড়েছে সরকারের বাজেট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থ সংকটে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারছে না মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। সব মিলিয়ে হরতাল, অবরোধ আর সহিংস রাজনীতির আগুনে পুড়ে অঙ্গার হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। প্রতিদিনে অসংখ্য যানবাহন পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। সহিংতার আগুনে পুড়ে প্রাণ যাচ্ছে সাধারণ মানুষের। প্রিয়জন হারিয়ে দিশাহারা পরিবার পরিজন। সহায় সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন অগ্নিদগ্ধদের পরিবার। এফবিসিসিআইর হিসেবে এক দিনের হরতাল বা অবরোধে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। যা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। এদিকে এমন সহিংস রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে পথে নেমেছেন দেশের ব্যবসায়ী সমাজ। কিন্তু কোনো কিছুতেই সমাধান বেরিয়ে আসছে না। একের পর এক হরতাল আর অবরোধ চলছেই। ফলে অর্থনীতির গতি থমকে দাঁড়িয়েছে। টানা তিন দফা অবরোধে সারা দেশে কয়েকশ গাড়ি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। এতে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে পোশাক কারখানাও। শুধু স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের কারখানা পুড়েই প্রায় হাজার কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়েছেন কারখানার মালিক। টানা হরতাল আর অবরোধের কারণে আমদানি-রপ্তানি প্রায় বন্ধ। এলসি খুলতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে গত এক মাসের এলসির খোলার হার প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই ঋণাত্দক পর্যায়ে চলে যাবে। বন্দরে আটকে আছে হাজার হাজার পণ্যবাহী জাহাজ। স্থলবন্দরগুলোতে কন্টেইনারের জট বাড়ছেই। নিরাপত্তাহীনতার কারণে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পণ্য পরিবহনে আগ্রহ হারাচ্ছেন চালকরা। ফলে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এতে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে পণ্যমূল্য। যার প্রভাবে জীবন যাত্রার ব্যয় বাড়ছে। সাধারণ মানুষ পড়েছে বিপাকে। এক মাসের ব্যবধানেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সূত্রমতে, জল ও স্থল উভয় বন্দরেই পণ্য উঠানামা বন্ধ রয়েছে টানা। এতে জাহাজ ও কন্টেইনারের জট সৃষ্টি হয়েছে। সঠিক সময়ে পণ্য খালাস না হওয়ায় অতিরিক্ত চার্জ গুনতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। এদিকে সড়ক পথেও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। যেখানে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার পণ্যবাহী ট্রাক ঢাকায় প্রবেশ করে সেখানে এক সপ্তাহে পাঁচশর কম ট্রাক ঢাকায় ঢুকেছে। অন্যদিকে দূরপাল্লার কোনো বাস চলাচল করতে না পারায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তির সঙ্গে বেড়েছে কর্মমুখী মানুষের ভোগান্তিও। এমন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে দ্রুত রাজনৈতিক সমঝোতায় বসার আহবান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মনিরুজ্জামান বলেন, ব্যাংক খাতে রাজনীতির অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক চেষ্টা করছে গ্রাহকদের পুশিয়ে দেওয়ার। কিন্তু সামষ্টিক অর্থনীতিতেও কিছু প্রভাব তো পড়ছেই। এটা উদ্বেগজনক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ বলেন, এভাবে হরতাল অবরোধ চলতে থাকলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। তখন আর টেনে তুলতে পারবেন না কেউই। এ জন্য বলি একটা সমঝোতায় আসুন। দেশের অর্থনীতিটাকে বাঁচান। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সবুর খান বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে। যা কর্মসংস্থান বৃদ্ধির অন্তরায়। সব ধরনের সহিংস রাজনীতি বন্ধের আহ্বান জানান তিনি। বিজিএমই’র সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির স্বার্থে সব ধরনের হরতাল ও অবরোধ থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। বর্তমানে তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। এ খাতের সম্ভাবনাকে তিলে তিলে শেষ করে ফেলা হচ্ছে। যার প্রভাবে দেশের অর্থনীতি অচল হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। পণ্য পরিবহবন ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী গোলাম মওলা বলেন, পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কেননা ঢাকায় কোনো ট্রাক ঢুকতে পারছে না। এ ছাড়া বন্দরের কোনো জাহাজ পণ্য খালাস করতে পারছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি।

Facebook Comments