জামায়াতের জ্বালাও পোড়াও চলছে, শুরু ‘পাল্টা’ হামলাও

0
6
Print Friendly, PDF & Email

দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত ও এর সহযোগী সংগঠন ছাত্রশিবিরের হামলা, জ্বালাও-পোড়াও চলছে। গতকাল রবিবারও নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রীর বাড়িতে বোমা হামলা হয়েছে। আগুন দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বাড়ি, দলীয় কার্যালয় ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে। কোথাও কোথাও জামায়াতের প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের খবরও পাওয়া গেছে।

    রাতে রাজধানীতে জামায়াতের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা কার্যালয়ে বোমা ও গুলি ছোড়া হয়। তবে কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, সেটা পুলিশ বলতে পারেনি।

   এর আগে গতকালই রাজধানীতে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর যৌথ সভায় বিএনপি-জামায়াতের নাশকতার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিরোধের ডাক দেওয়া হয়েছে।

   একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া জামায়াতের নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার আগে-পরে গত কয়েক দিন তাদের নাশকতা ও সহিংসতা চলছে। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। রায় কার্যকরকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার রাত থেকে সহিংসতা শুরু করে জামায়াত। যদিও ওই দিন রায় কার্যকর আদালতের আদেশে স্থগিত করা হয়েছিল।

   জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা সড়কে নির্বিচারে যানবাহনে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, হিন্দু সম্প্রদায়, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিচারকদের বাড়ি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, সরকারি বিভিন্ন কার্যালয় হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। চট্টগ্রাম, বগুড়া, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী, হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি, মন্দির, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। জামায়াতের এই কয়েক দিনের সহিংসতায় ৩০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।

   এর আগে জামায়াত নেতারা দেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইল এলাকা জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেওয়ার পর আবারও হুমকি দেওয়া হয়েছিল প্রতি ফোঁটা রক্তের জন্য সরকারকে চরম মূল্য দিতে হবে।

    সংগ্রাম কার্যালয়ে বোমা, গুলি : গতকাল রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার কার্যালয় লক্ষ্য করে চার-পাঁচটি ককটেল ছোড়ে একদল দুর্বৃত্ত। তারা ১০-১২টি মোটরসাইকেলে করে সেখানে এসে হামলা চালায়। মুহূর্তেই ফাঁকা হয়ে যায় ওই এলাকা। পত্রিকাটির কার্যালয়ের ফটক বন্ধ ছিল। তবে পেট্রলবোমার আঘাতে কার্যালয়ের নিচে থাকা পত্রিকার বান্ডেলে আগুন ধরে যায়। সেখানকার লোকজন দ্রুত আগুন নিভিয়ে ফেলে। এরপর হামলাকারীরা কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে এবং যাওয়ার আগে রাস্তায় ককটেল ফাটায়।

    নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পত্রিকার কয়েকজন কর্মচারী জানান, ওই এলাকার যুবলীগকর্মীরা হামলা চালিয়েছে। তবে তাঁরা নির্দিষ্ট করে কারো নাম বলতে পারেননি।

    রমনা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কামরুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে তাঁরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। কিন্তু সেখান থেকে কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা যায়নি। পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, কে বা কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁদের কাছে ওই সময় কেউ অভিযোগও করেনি।

    ‘পাল্টা’ আগুন, ভাঙচুর : লালমনিরহাটের পাটগ্রামে তাণ্ডবে চারজন নিহত হওয়ার ঘটনার পর গতকাল সন্ধ্যায় শহরের খাতাপাড়া এলাকায় জেলা জামায়াতের কার্যালয় ভাঙচুর হয়েছে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ছাত্রলীগ নেতা মিরাজুল ইসলাম মিরাজ খুনের জের ধরে গতকাল সন্ধ্যায় উপজেলা সদরের মীরগঞ্জ সড়কে অবস্থিত জামায়াত পরিচালিত আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবন পুড়িয়ে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। আগুনে চেয়ার, বেঞ্চ, যাতায়াতের ভ্যান ও আসবাব পুড়ে গেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ নিজাম উদ্দিন জানিয়েছেন। রায়পুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) নাছিরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ঘটনাটি তিনি শুনেছেন। সিলেটে ছাত্রলীগ নেতা মোশাহীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে সংগঠনের ক্ষুব্ধ কর্মীরা গতকাল সন্ধ্যায় জামায়াত নেতাদের মালিকানাধীন উপশহরের ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে হামলা ও ভাঙচুর করেছে।

এর আগে শনিবার রাতে ফেনী শহরে জামায়াত সমর্থকদের একটি বিপণিবিতান ও জেলা জামায়াতের কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়েছে। খাজুরিয়া রাস্তার মাথা এলাকার ওই বিপণিবিতান নির্মাণসামগ্রীর। শান্তি কম্পানি রোডে জেলা জামায়াতের কার্যালয়ে দেওয়া আগুনে পুড়ে গেছে একটি প্রাইভেট কার, দুটি মোটরসাইকেল ও কিছু আসবাব।

মন্ত্রীর বাড়ি, আ.লীগ কার্যালয়, নেতার বাড়িতে বোম-আগুন : গতকাল ভোরে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার ছাদেকনগর এলাকায় নির্বাচনকালীন সরকারের পানিসম্পদমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদের বাড়িতে বোমা হামলা হয়েছে। মোটরসাইকেলে করে যাওয়া তিন যুবক মন্ত্রীর বাড়ি লক্ষ্য করে দুটি ককটেল নিক্ষেপ করে।

এরই মধ্যে হাটহাজারী আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া আনিসুল ইসলাম মাহমুদের চাচা আকবর হায়দার চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভোর ৪টার দিকে পর পর দুটি ককটেল বিস্ফোরণের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে বের হয়ে কাউকে দেখা যায়নি।’

হাটহাজারী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আ ফ ম নিজাম উদ্দিন বলেন, খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

এর আগে গত শুক্রবার রাতে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিমের নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার কাবিলপুর গ্রামের বাড়িতে অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তের পেট্রলবোমা হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। শনিবার রাতেও তাঁর বাড়ির সামনে গাছের গুঁড়ি ও সীমানা পিলার ফেলে অবরোধ সৃষ্টি এবং নাশকতার চেষ্টা করে একদল দুর্বৃত্ত। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে।

সেনবাগ থানার ওসি সাইফুল আহম্মেদ ভূঁইয়া জানান, ওই তিনজনকে বিচারপতির বাড়িতে হামলা ও গুলিবর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গতকাল দুপুরে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

শনিবার রাতে ঝালকাঠির রাজাপুরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পুড়ে গেছে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি এবং সব আসবাব। ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মহসিন হাওলাদার জানান, জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা সুক্তাগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে পেট্রল দিয়ে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে আটক করা হয়েছে বলে রাজাপুর থানার ওসি নজরুল ইসলাম জানান।

একই রাতে পিরোজপুরের শিকদার মল্লিক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি বিধান চন্দ্র মিস্ত্রির দক্ষিণ গাবতলা গ্রামের বাড়িতে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। আগুনে একটি কাঠের ঘর পুড়ে গেছে। অন্য একটি ঘরের আগুন দ্রুত নিভিয়ে ফেলায় তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

গতকাল জয়পুরহাট সদরের পুরানাপৈল বাজারে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা পেট্রলবোমা মেরে কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া চেষ্টা করে। আগের রাত মেহেরপুরের গাংনী থানা ও গাংনী বাজারের দুটি স্থানে বোমা হামলা হয়েছে। তবে কেউ হতাহত হয়নি।

গাংনী থানার ওসি মাসুদুল আলম জানান, হরতালে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্যই জামায়াতের কর্মীরা বোমা ছুড়ে পালিয়ে যায়।

Facebook Comments