মন্ত্রী এমপিদের সম্পদের পাহাড় এবং জেদ ও তামাশার নির্বাচন

0
8
Print Friendly, PDF & Email

    গত পাঁচ বছরে সরকারি দলের মন্ত্রী-এমপিরা সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। একদলীয়-একতরফা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে যে সম্পদ বিবরণী তারা নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছেন, তাতে ব্যতিক্রম বাদে সবারই অর্থ-সম্পদের অবিশ্বাস্য স্ফীতি লক্ষ্য করা গেছে। অনেকের ধারণা, হলফনামায় বর্ণিত সম্পদ বিবরণীর বাইরেও তাদের বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে বা থাকতে পারে। মন্ত্রী বা এমপির দায়িত্ব পালনকালে তারা এত সম্পদ কিভাবে অর্জন করলেন, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মনে হতে পারে, তারা অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে, জনসেবার প্রতি মনোযোগী না হয়ে ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়ানোর কাজেই নিজেদের অধিক ব্যস্ত রেখেছেন। বৈধ পথে কারো আয় বাড়লে বলার কিছু থাকে না। তারা এত সম্পদ বৈধভাবে অর্জন করেছেন, তা বিশ্বাস করা কঠিন। অনৈতিক পন্থা অবলম্বন বা দুর্নীতি করা ছাড়া এই সম্পদ সংগ্রহ করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। এই বিবেচনায় তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত বলা ছাড়া উপায় থাকে না। বহুদিন ধরেই বলা  হচ্ছে, রাজনীতি ব্যবসায়ে পরিণত হয়েছে। রাজনীতির চেয়ে ধনী হওয়ার এত সহজ পথ আর নেই। মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদ বিবরণীতে তারই প্রমাণ রয়েছে।

দুর্নীতি নিরোধের শপথ নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারের মন্ত্রী ও সরকারি দলের এমপিদের প্রশ্নবিদ্ধ সম্পদস্ফীতি থেকে প্রতীয়মান হয়, দুর্নীতি রোধে সরকার কিছুই করেনি বরং এই সময়ে দুর্নীতি সর্বগ্রাসী রূপ লাভ করেছে। নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত দুর্নীতি নির্বাধে বিস্তার লাভ করেছে। জনসেবকদের আত্মসেবক হয়ে ওঠার এই চিত্রে দেশের সর্বস্তরের মানুষ বিস্মিত-হতবাক। সঙ্গতকারণেই সরকার এবং মন্ত্রী-এমপিদের এতে বিব্রত হওয়ার কথা। কিন্তু তাদের আচরন ও কথা বার্তায় তা প্রতীয়মান হচ্ছে না। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে : যার এককান কাটা সে যায় গ্রামের বাইরে দিয়ে। আর যার দু’কান কাটা সে যায় গ্রামের ভেতর দিয়ে। যারা গত পাঁচ বছরে নানা কায়দা-কৌশলে নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তাদের বিন্দুমাত্র শরম ও আত্মদংশন আছে বলে মনে হচ্ছে না। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার বড়গলা করে সম্পদ সংগ্রহের পক্ষে কথা বলছেন। তত্ত্বের আকারে সবকিছু জায়েজ করার চেষ্টা করছেন। এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রীর একটি বক্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি মন্ত্রী-এমপিদের আয় ও সম্পদ বৃদ্ধি স্বাভাবিক বলে অভিহিত করেছেন। তার তত্ত্ব : ‘দুনিয়ার ইতিহাস হচ্ছে, যারা ক্ষমতায় থাকে, তাদের আয় বাড়ে। সব দেশেই এটা হয়।’ কেন হয়, তার কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা তিনি দেননি।

অর্থমন্ত্রীর একটি প্রিয় শব্দ ‘রাবিশ’। কোনো কথা বা কোনো কিছু পছন্দ না হলেই তিনি এই শব্দটি ব্যবহার করেন। মন্ত্রী-এমপিদের আয় ও সম্পদ বৃদ্ধির পক্ষে তিনি যে তত্ত্বটি দিয়েছেন তা ঐ রাবিশের পর্যায়ে পড়ে কিনা বিদ্বতজনেরা বলতে পারবেন। এ প্রসঙ্গে যে নজিরটি তিনি উল্লেখ করেছেন, সেটা খুবই চমকপ্রদ। বলেছেন : ‘প্রাচীনকালে বর্বরদের গোত্র প্রধানও সম্পদশালী হতেন। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।’ তিনি তার সহকর্মী মন্ত্রী ও এমপিদের প্রাচীনকালের বর্বরদের গোত্র প্রধানের সঙ্গে তুলনা করে আত্মপ্রসাদ লাভ করেছেন কিনা, আমরা বলতে পারব না। তবে যাদের বোঝার কথা তারা ঠিকই বুঝে নিয়েছেন, মন্ত্রী-এমপিরা প্রাচীনকালের বর্বরদের গোত্র প্রধানের চেয়ে কোন অংশে ন্যূন নন। ভালোই হলো, মন্ত্রী-এমপিদের আয় ও সম্পদ বৃদ্ধির এই ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়া’র বিষয়টি জনগণ অবহিত হতে পারল।

অর্থমন্ত্রী সম্পর্কে অনেকেই অনেক বথা বলেন। কেউ বলেন, তার কথার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। যখন যা মনে আসে, তাই বলেন। কেউ বলেন, তিনি জাতে মাতাল তালে ঠিক। তার বিদ্যাবত্তা, অভিজ্ঞতা ও বয়সের নিরিখে এই কথাগুলো কতটা যৌক্তিক ও শোভনীয় সেটা অবশ্যই একটা বিবেচ্য বিষয়। তার আর একটি সাম্প্রতিক বক্তব্যের কথাও এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। মেরুদ-হীন, আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনকে সঙ্গী করে সরকার যে একদলীয়-একতরফা নির্বাচন করছে, দেশী-বিদেশী সব মহলই একমত, সে নির্বাচন কোথাও গ্রহণযোগ্য হবে না। কিন্তু সরকার মরিয়া। যে কোনো মূল্যে এ নির্বাচন সে করবেই। এই প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ভোটারবিহীন নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। কানাডার হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তার পূর্বোক্তির কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ভোটার ছাড়া এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না।’ ৫০ শতাংশের বেশি আসনে প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে গেছে। বড় দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। এটা কোনো নির্বাচনই না।’

মনে হতে পারে, এটা তারা বিবেকের উচ্চারণ। আসলেই কি তাই? ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের তিনি একজন নীতি-নির্ধারক পর্যায়ের ব্যক্তি। পাঁচ বছর ধরে সরকারের অর্থমন্ত্রী। তিনি যদি মনে করেন, এটা কোনো নির্বাচনই না, তাহলে তো  তার উচিত ছিল এক রকম প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন, বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণবিহীন তামাশার নির্বাচন থেকে দল ও সরকারকে বিরত রাখার চেষ্টা করা। তিনি কি তা করেছেন? এমন কোনো প্রমাণ নেই। তিনি তার অভিমত দলীয় ও সরকারী পর্যায়ে তুলতে পারতেন, অন্যদের প্রভাবিত করতে পারতেন। প্রয়োজনে পদত্যাগ করার মতো চরম সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। এর একটিও তিনি করেননি। এর বড় প্রমাণ, তিনি নিজেও একতরফা-একদলীয় ও পাতানো নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। এমনকি যে ৫০ শতাংশের বেশি প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, সেই সৌভাগ্যবানদের তিনিও একজন। এটা কোনো নির্বাচনই না, বলা তাই তার শোভা পায় না। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
মুখে এক আর কাজে আরেক। এই নীতির অনুসরণই আজকের রাজনৈতিক সঙ্কটের মূল কারণ। এই নীতির কারণেই ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা আজ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। সরকারও অবিশ্বাস্য রকম জনবিচ্ছিন্নতার শিকারে পরিণত হয়েছে। দলীয় প্রধান থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে জনসমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেছেন, পেয়েছেনও। সেই দলটিই যখন পাতানো নির্বাচন ও তার প্রক্রিয়ায় শামিল হয়, ভোটবিহীন, ভোটারবিহীন, নির্বাচনবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রলম্বিত করতে চায়, তখন জনগণের বিস্মিত, বিরক্ত ও বিক্ষুব্ধ হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। পাঁচ বছর অন্তর জনগণ ভোট দেয়ার সুযোগ পায়, শাসক নির্বাচনের অধিকার প্রয়োগ করার ক্ষমতা পায়। জনগণই যে ক্ষমতার উৎস, সেটা নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়। অথচ এবার তথাকথিত নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসনের ভোটাররা ভোট দেয়ারই সুযোগ পাচ্ছে না। ভোটের আগেই তাদের ‘প্রতিনিধি’ নির্বাচিত হয়ে গেছেন। তারা জানলো না, ভোট দিলো না কিন্তু নির্বাচন হয়ে গেল। একে কোনোভাবেই জনগণের ভোটাধিকার সংরক্ষণ বলে না। এই যদি ভোটাধিকার সংরক্ষণ হয় তবে ভোটাধিকার বঞ্চনা কাকে বলে! যে আসনগুলোর নির্বাচন হতে বাকি আছে, সেই নির্বাচন কি ধরনের হবে, সহজেই অনুমেয়। অধিকাংশ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ প্রার্থী। কিছু সংখ্যক আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির প্রার্থী। তাদের পার্টিপ্রধান জানিয়ে দিয়েছেন তার দল নির্বাচনে নেই। প্রার্থী হিসেবে যারা এখনও টিকে আছেন, শেষ পর্যন্ত তারা কি করবেন, নিশ্চিত নয়। অল্প কয়েকটি আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়ার্কার্স পার্টি বা জাসদের প্রার্থী। এসব প্রার্থী ওয়ার্ড কমিশনার হওয়ার যোগ্যতাও রাখেন না। এই ‘নিজেরা করি’ ধরনের নির্বাচনে ভোটাররা কেন ভোট দিতে আসবে?

গণতন্ত্রের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এরকম নির্বাচন কোনো দেশে কখনো হয়েছে বলে নজির নেই। সরকার ও নির্বাচন কমিশন এই নজিরবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর। দোহাই দেয়া হচ্ছে সংবিধানের। বলা হচ্ছে, সংবিধান রক্ষার জন্যই এ নির্বাচন করতে হচ্ছে। সংবিধানের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অথচ অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আওয়ামী লীগ ও তার রাজনৈতিক মিত্ররা যখন আন্দোলন করেছিল তখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র দলের নেতারা শত সহ¯্রবার বলেছিলেন, জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ই বড়- সংবিধান বড় নয়। জনগণ আগে, সংবিধান আগে নয়। এখন উল্টো সুরে সেই আওয়ামী লীগ নেতারা যা বলছেন, তার সরল অর্থ দাঁড়ায়, সংবিধান বড় জনগণ বড় নয়। সংবিধান আগে জনগণ আগে নয়। সংবিধান রক্ষার নামে তারা জনগণকে বাদ করে দিয়েছেন। তা না হলে এরকম প্রহসনের নির্বাচন হতে যাবে কেন?

গণতন্ত্রের কথা বলা হবে, আর কৌশলে জনগণকে বাইরে রেখে, উপেক্ষা করে ক্ষমতা ধরে রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে, এটা কি ধরনের গণতন্ত্র? কি ধরনের গণতন্ত্র প্রীতির পরিচায়ক? এর মধ্যে গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রপ্রীতির চিহ্নমাত্র নেই। জনগণকে এতটা অশ্রদ্ধা ও অবহেলা করার দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় না। আর এই অশ্রদ্ধা ও অবহেলা এমন একটি দলের পক্ষ থেকে প্রদর্শিত হচ্ছে, যে দলটির গণতন্ত্রের সংগ্রামে বিশাল অবদান আছে। সংবিধান অবশ্যই রাষ্ট্রের প্রধান আইন-বিধান। তবে তা কোনো বিবেচনাতেই জনগণের চেয়ে বড় নয়। জনগণের জন্যই সংবধিান, সংবিধানের জন্য জনগণ নয়। জনগণের ইচ্ছা ও সর্বসম্মত রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংযুক্ত করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার ও সরকারি দল সেই গণইচ্ছা ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রতি বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে এবং সর্বমহলের বিরোধিতা বেআমলে এনে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রহিত করে। চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের সূত্রপাত হয় এখান থেকেই।

প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ তার জোটভুক্ত দলগুলো শুরু থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের বিরোধিতা করে আসছে এবং সংবিধানে পুনরায় ওই ব্যবস্থা সংযুক্ত করার জন্য আন্দোলনে আছে। সরকার তাদের দাবিকে ন্যূনতম পাত্তা দেয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। যেহেতু সরকার বা সরকারি দল ওই ব্যবস্থা বাতিল করেছে, সুতরাং সরকারেরই উচিত ছিল বিরোধীদলগুলোর সঙ্গে সংলাপের আয়োজন করে তার যুক্তি ও বক্তব্য তুলে ধরে তাদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করা, গৃহীত সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থার পক্ষে তাদের সম্মতি আদায় করা। সরকার তা দীর্ঘদিনেও করেনি। শেষ দিকে সংলাপের প্রসঙ্গ সামনে এলেও এবং সরকারের তরফে সংলাপের কথা বলা হলেও তাতে আন্তরিকতার যথেষ্ট অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফারনান্দেজ তারানকো ছয় দিনের অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে দু’দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে সংলাপের সূচনা করে দিয়ে গেলেও সরকারের অনীহার কারণে তা আর এগোয়নি। অতঃপর সরকারের তরফে বলে দেয়া হয়েছে, আর সংলাপের সুযোগ নেই। নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগও অবশিষ্ট নেই।

কথাটি কতটা ঠিক তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্লেষক  ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে, সংলাপ-সমঝোতা এখনও হতে পারে এবং এই নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণও সম্ভব হতে পারে। তার জন্য নির্বাচনের বর্তমান শিডিউল পরিবর্তন করতে হবে। দু’পক্ষ বিশেষ করে সরকার যদি সমঝোতায় আন্তরিক হয়, তাহলে তা হতে পারে। শিডিউল পরিবর্তন করলে বিরোধী দলগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ খুলে যেতে পারে। ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন করা কোনো কারণে সম্ভবপর না হলে বর্তমান সংসদ ভেঙে দিলে আরও তিন মাস সময় পাওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ সংবিধানের মধ্যে থেকেই সবদলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হতে পারে। উল্লেখ বাহুল্য, এটা একান্তভাবেই সরকারের আগ্রহ ও সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। প্রধান বিরোধীদল বিএনপির চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া গত মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেছেন : ‘জনগণের দাবি মেনে সমঝোতায় আসুন। এখনও সময় শেষ হয়ে যায়নি। প্রহসনের নির্বাচনের তফসিল প্রত্যাহার করুন। আলোচনা শুরু করুন। আমরাও আলোচনায় বসতে রাজি আছি। জনগণের অর্থের অপচয় করে ভোটবিহীন, প্রার্থীবিহীন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন একটা অর্থহীন প্রহসনের নির্বাচন করার প্রয়োজন নেই। এতে শুধু আপনারাই কলঙ্কিত হবেন না, গণতন্ত্রও ধ্বংস হবে।’

বেগম খালেদা জিয়ার আহ্বান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের তফসিল বাতিল করে আলোচনা-সমঝোতার পথে আসবেন, এমন আলামত দেখা যাচ্ছে না। বরং নির্বাচনের পথেই সরকার এগিয়ে যাচ্ছে, সেটা স্পষ্ট। নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞা মাফিক কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে নির্বাচনের দায়িত্ব পালনের জন্য সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন বরাবরই অন্তরালের নির্দেশে কাজ করে যাচ্ছে। এক সময় এই নির্বাচন কমিশন থেকেই বলা হয়েছিল, নির্বাচনে সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করার প্রয়োজন নেই। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীগুলোই এজন্য যথেষ্ট। পরে এই নির্বাচন কমিশন থেকেই বলা হয়েছে, এত বড় নির্বাচন সশস্ত্রবাহিনীর সহায়তা ছাড়া সম্ভব নয়। শেষোক্ত কথা মতেই সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। অনেকেরই স্মরণ রাখার কথা, নির্বাচন কমিশন থেকেই একথা বলা হয়েছিল, রাজনৈতিক সমঝোতার অপেক্ষায় আছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা সে জন্যই বিলম্বিত হচ্ছে। পরে রাতারাতি শিডিউল ঘোষণা করা হয়। প্রশ্ন উঠলে বলা হয়, সমঝোতা হলে শিডিউল পাল্টানো কোনো ব্যাপার নয়। প্রয়োজন হলে পাল্টানো হবে। কিন্তু শিডিউল আর পাল্টানো হয়নি। রাজনৈতিক সমঝোতাও হয়নি। সরকার সংলাপ-সমঝোতায় গরজ দেখায়নি। নির্বাচন কমিশনও শিডিউল পাল্টায়নি। এ থেকে এটা বুঝতে মোটেই কষ্ট হয় না, নির্বাচন কমিশন সরকারের পরিকল্পনা ও মতলব অনুযায়ীই কাজ করছে। একচুলও এদিক-সেদিক যাচ্ছে না। এর সর্বশেষ প্রমাণ মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদ বিবরণী নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করতে বাধা সৃষ্টি। সরকারি দলের তরফে আপত্তি জানানোর পরপরই ওই সম্পদ বিবরণী আর ডাউনলোড করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ ওঠার পর নির্বাচন কমিশনের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনে প্রার্থীদের জমা দেয়া হলফনামা প্রকাশ এবং প্রচার অব্যাহত রাখা হবে। অনেকের মতে, ইচ্ছাকৃভাবেই এটা করা হয়েছে। প্রার্থীরা যে সম্পদ বিবরণী জমা দিয়েছেন, তা তাদের স্বেচ্ছাপ্রদত্ত। এই বিবরণী প্রকাশ ও প্রচারযোগ্য। আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানোর পর সিইসি সাংবাদিকদের জানান, বিষয়টির আইনগত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, আইনগত দিক খতিয়ে না দেখেই কি ওগুলো ওয়েবসাইটে দেয়া হয়েছিল? নির্বাচন কমিশনের দলবাজ মনোবৃত্তি রাজনৈতিক সঙ্কট এতটা জটিল হয়ে ওঠার জন্য বিশেষভাবে দায়ী। নির্বাচন কমিশন তার কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে, এটি ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েরই বর্ধিতাংশ’। সরকার ও নির্বাচন কমিশন একজোট হয়ে যে নির্বাচন উপহার দিতে যাচ্ছে, তা কোনো বিবেচনাতেই গ্রহণযোগ্য হবে না। এই নির্বাচন ভোটাধিকারহারা দেশের জনগণের কাছে তো গ্রহণযোগ্য হবেই না, আন্তর্জাতিক মহলেও গ্রহণযোগ্য হবে না। এর প্রমাণ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের নির্বাচন-পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সিদ্ধান্ত। যারা এই নির্বাচনকেই বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছে না তারা সেই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারকে কতটা গ্রহণযোগ্য ও সমর্থনযোগ্য বলে মনে করবে সেটাই প্রশ্ন এবং এই প্রশ্নটি কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না।

Facebook Comments