গৃহবন্দি খালেদা

0
7
Print Friendly, PDF & Email

     গৃহবন্দি বিরোধী নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তার বাসভবন ঘিরে রেখেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশ প্রটোকল প্রত্যাহার করে নিয়েছে সরকার। ব্যারিকেড সরিয়ে খালেদা জিয়া আজকের কর্মসূচিতে যাওয়ার চেষ্টা করলেও তা আটকে দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা  বাহিনী। তার বাসভবনের সামনের দু’দিকের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে দু’টি বালুভর্তি ট্রাক। বিরোধীদলীয় নেতার প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) আবদুল মজিদ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বিরোধীদলীয় নেতার মর্যাদা অনুসারে প্রাপ্য পুলিশি প্রটোকল প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। তার নিরাপত্তায় নিয়োজিত সমস্ত প্রটোকল ও পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে তাদের বদলে বিপুল সংখ্যক পুলিশ, মহিলা পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি অবস্থান নিয়েছে। অফিস অভিমুখে যাওয়ার রাস্তা দু’টি বন্ধ করে সেখানেও অসংখ্য র‌্যাব ও বিজিবি অবস্থান করছে। এছাড়া, রাস্তার দু’ধারেই ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে রাখে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয় সূত্র জানায়, গতকাল সন্ধ্যায় বিএনপি চেয়ারপারসনের ভাই মরহুম সাঈদ এস্কান্দারের ছেলের বিয়েতে যোগদানের জন্য তার প্রথমে গলফ ক্লাবে ও পরে গুলশান কার্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল। গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে রাতে বিকল্প ধারা প্রেসিডেন্ট ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম ও জাসদ (রব) সভাপতি আসম আবদুর রবের নেতৃত্বে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট নামে নবগঠিত রাজনৈতিক জোটের শীর্ষনেতাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা ছিল। এদিকে ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’কে কেন্দ্র করে গত তিন দিন ধরে খালেদা জিয়ার বাসভবন ও রাজনৈতিক কার্যালয়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন ছাড়া কোন নেতাকর্মীকে বাসভবনে ঢুকতে দেয়া হয়নি। নেতাকর্মীদের কয়েকজনকে সেখান থেকে গ্রেপ্তার ও কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর ছেড়ে দেয়া হয়। কাউকে কাউকে আটক করে পৌঁছে দেয়া হয় তাদের বাসায়। এমন পরিস্থিতিতে শুক্রবার নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে কয়েক ঘণ্টা একাকী অপেক্ষা করতে হয় খালেদা জিয়াকে। পরে তার সঙ্গে কয়েকজন সাংবাদিক নেতা সাক্ষাৎ করেন। গতকাল বিকালে তার বাসভবন ও রাজনৈতিক কার্যালয়ে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ ও র‌্যাব। বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইং সূত্র জানায়, রাত ৮টার দিকে দু’টি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বাসভবন থেকে বেরোনোর প্রস্তুতি নেন খালেদা জিয়া। এ সময় তার নিরাপত্তার দায়িত্বরত পুলিশের প্রটোকলকে ডাকা হয়। পুলিশ প্রটোকলের গাড়ি সেখানে গেলে তাদের সরিয়ে দেয় খালেদা জিয়ার বাসভবনের সামনে অবস্থানরত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। ফলে ভাইপোর বিয়ের অনুষ্ঠান ও রাজনৈতিক কার্যালয়ে যেতে পারেননি বিরোধী নেতা খালেদা জিয়া। এর আগে শুক্রবার তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে এক ভিডিও বার্তায় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, আমি উপস্থিত হতে না পারলেও সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত আপনারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে দলের ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, যে কোন মূল্যে নয়া পল্টনে সমাবেশে খালেদা জিয়া উপস্থিত থাকবেন। পরে রাত সাড়ে আটটার দিকে খালেদা জিয়ার বাসভবনের সামনের রাস্তা দু’টি বালু বোঝাই ট্রাক দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়। ট্রাকের একজন চালক জানান, গাবতলী থেকে ট্রাক দু’টি বালু বোঝাই করে বনানীর একটি নির্মাণাধীন বাড়িতে নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু পুলিশ তাদের গাবতলী থেকে বিরোধী নেতার বাসার সামনে নিয়ে আসে। তাদের বলা হয়েছে আগামীকাল পর্যন্ত গাড়িগুলো সেখানে থাকবে। মহিলা পুলিশ কেন আনা হয়েছে- জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান জোনের সহকারী কমিশনার নুরুল আলম বলেন, বিরোধী দলের নেত্রীর অধিকতর নিরাপত্তার জন্যই সেখানে মহিলা পুলিশ রাখা হয়েছে। তবে খালেদার যাতায়াতের ক্ষেত্রে কোন বাধার সৃষ্টি করা হচ্ছে না। ওদিকে বিরোধী নেতার প্রটোকল প্রত্যাহারের নিন্দা জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিবৃতিতে তিনি বলেন, রাত ৮টা থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে তার বাসভবনে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবরুদ্ধ করে রেখেছে। তাকে তার গুলশানের কার্যালয়ে যেতে দেয়া হচ্ছে না। বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে তার বাসভবন ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। বাসার সামনে ট্রাক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক গাড়ি এলোপাতাড়ি করে রেখে রাস্তার দু’পাশে ব্যারিকেড দেয়া হয়েছে। মির্জা আলমগীর  বলেন, আমি সরকারের এহেন ন্যক্কারজনক ও চরম ফ্যাসিবাদী আচারণের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে জানাচ্ছি, বিরোধীদলীয় নেতার নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের সরকার অবৈধ ও বেআইনিভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। আমি অবিলম্বে বিরোধীদলীয় নেতার সার্বিক নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক  চলাফেরা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহবান জানাচ্ছি। অন্যথায় উদভূত পরিস্থিতির সরকারকে দায়িত্ব বহন করতে হবে। অবিলম্বে বিরোধী নেতার বাসভবনের সামনে থেকে ব্যারিকেডসহ অতিরিক্ত পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি সরিয়ে দেয়ার দাবিও জানান তিনি। এদিকে রাত সোয়া ১০টায় রুহুল আমিন গাজী, সৈয়দ আবদাল আহমেদ ও ইলিয়াস খানসহ ৬ সাংবাদিক নেতা খালেদা জিয়ার বাসভবনে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

 

টার্গেট ঢাকা
টার্গেট ঢাকা। সরকার ও বিরোধী দল দু’পক্ষের দৃষ্টিই রাজধানীতে। রাজধানীতে বড় ধরনের শোডাউন করে নির্দলীয় সরকারের দাবির জানান দিতে প্রস্তুত বিরোধী দল। এ লক্ষ্য নিয়েই আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি। সারা দেশ থেকে জাতীয় পতাকা হাতে নয়া পল্টনমুখী বিরোধী কর্মী-সমর্থকরা। কর্মসূচি সফল করতে দৃঢ় অবস্থানে বিরোধী জোট। যে কোন মূল্যে এ গণতন্ত্রের অভিযাত্রা সফল করতে চায় তারা। তাদের সমর্থন করছেন দুই জোটের বাইরে থাকা বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। গণতন্ত্রের অভিযাত্রাকে প্রতিহতের ডাক দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিরোধী দলের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঢাকার রাজপথে অবস্থান নেয়ার ঘোষণাও দিয়েছে তারা। সরকার ও বিরোধী দলের এমন মুখোমুখি অবস্থানে জনমনে বিরাজ করছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক। বিরাজ করছে টান টান উত্তেজনা। এদিকে ঢাকামুখী বিরোধী নেতাকর্মীদের স্রোত ঠেকাতে তৈরি করা হয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। বিরোধী দলের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঢাকামুখী সব বাস-লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ঢাকা অভিমুখে দেশের কোনপ্রান্ত থেকেই চলাচল করতে পারেনি বাস-ট্রাক। চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট ও খুলনাসহ বেশির ভাগ মহাসড়কে ছিল অঘোষিত অবরোধ। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ছেড়ে আসা স্বল্প সংখ্যক বাসও ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে রাজবাড়ী, টাঙ্গাইল, নরসিংদী, কুমিল্লা, ফরিদপুর থেকে। অবরোধের মধ্যে আর্থিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতি শিকার করে চালানো হয়েছিল ট্রেন। বিনা ঘোষণায় গতকাল বন্ধ ছিল নানা রুটের ট্রেনের চাকা। তল্লাশি ছাড়াও মধ্যপথ থেকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে ট্রেন। নৌপথ রুখতে লঞ্চ মালিকদের চাপ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। লঞ্চগুলো নোঙর করানো হয়েছে মাঝনদীতে। বন্ধ রাখা হয় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া, মাওয়া-কাওড়াকান্দি ফেরি ও সিপড বোট সার্ভিস। ‘ঢাকামুখী গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ কর্মসূচিতে নাশকতার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে সরকারের তরফে। এই কারণে বাস-লঞ্চ বন্ধ রাখা হয়েছে বলে মালিকরা জানিয়েছেন। তবে বিএনপির অভিযোগ, বিরোধী দলের কর্মসূচি বানচাল করতে বাস-লঞ্চ বন্ধ করে সরকারই ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। যান চলাচল বন্ধ থাকলেও থেমে নেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশি। রাজধানীর প্রতিটি প্রবেশমুখেই বসানো হয়েছে পুলিশের একাধিক তল্লাশি চৌকি।  নাশকতার আশঙ্কায় থাকা পুলিশ সদস্যরা কাউকে সন্দেহভাজন মনে করলেই গাড়ি থেকে নামিয়ে দিচ্ছেন। গ্রেপ্তার করা হচ্ছে শ’ শ’ কর্মী-সমর্থককে। মহাসড়কে পুলিশের এ তল্লাশির পাশাপাশি টহল দিতে দেখা যাচ্ছে সেনাবাহিনী ও বিজিবিকে। তবু থেমে নেই গণতন্ত্রের অভিযাত্রা। খালেদা জিয়ার ডাকে সাড়া দিয়ে শত বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে সারা দেশ থেকে ১৮ দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী-সমর্থকরা গতকাল ঢাকায় এসেছেন। মার্চ ফর ডেমোক্রেসি সফল করতে সারা দেশ থেকে রাজধানী ঢাকার দিকে ঢল নেমেছে মানুষের। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হয়রানি ও তীব্র শীত উপেক্ষা করে, মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে, বাইসাইকেলে চড়ে, নৌকা-ট্রলারে করে ছুটে আসছেন রাজধানীর দিকে। গণগ্রেপ্তারেও থেমে নেই রাজধানীমুখী জনস্রোত। নৌপথে ছোট ছোট বোটে করে ঢাকায় এসেছে বহু সংখ্যক নেতাকর্মী। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে অনেক নেতাকর্মী সপরিবারেও ঢাকায় এসেছেন। কষ্ট শিকার করে নানা কৌশলে ঢাকা ঢুকছেন বিরোধী নেতাকর্মীরা। সারা দেশ থেকে কর্মসূচিতে আসা নেতাকর্মীরা সেখান থেকেই রিকশা, ভ্যান, অটোরিকশাসহ নানা ভাবে ঢুকছেন রাজধানীতে। ঢাকা প্রবেশের পথ বন্ধ, এলেও দুর্ভোগ। যারা বিভিন্নভাবে ঢাকায় পৌঁছতে পেরেছেন, তাদের জন্য নতুন দুর্ভোগ হয়ে দেখা দিয়েছে অভ্যন্তরীণ রুটে বাসের অভাব। সেই সঙ্গে পুলিশের ‘নির্দেশে’র কারণে আবাসিক হোটেলগুলোতেও উঠতে পারছেন না তারা। রাজধানীসহ সারা দেশে অব্যাহত রয়েছে ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারে যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা কর্মসূচির অনুমতি মেলেনি পুলিশের তরফেও। রাতে বিরোধী নেতাকে বাধা দেয়া হয়েছে বাসভবন থেকে নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে যেতে। তুলে নেয়া হয়েছে পুলিশ প্রোটেকশন। তবে অনুমতি না মিললেও ঘোষিত কর্মসূচিতে যোগ দিতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অনড়। জাতীয় প্রেস ক্লাবে গতকাল সন্ধ্যায় এক ব্রিফিংয়ে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম বলেছেন, আজকের সমাবেশ হবে শান্তিপূর্ণ। গণতন্ত্র রক্ষার এই সমাবেশে বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া অবশ্যই উপস্থিত থাকবেন। যে কোন মূল্যে এই সমাবেশ সফল করা হবে। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্ট বারের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, পল্টনে গণতন্ত্রের উৎসব হবে আর সরকারের হবে পতন। সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষায় আমরা সেদিন প্রয়োজনে জীবন দেব, তবু পিছপা হবো না। ইতিমধ্যে সারা দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় পৌঁছেছেন। হাজার হাজার মানুষ ঢাকার পথে। কাল ঢাকায় মানুষের ঢল নামবে। ওদিকে ক্রিকেট স্ট্যাম্পে পতাকা বেঁধে মিছিল, সাংগঠনিক ১০০টি ওয়ার্ড ও ১৮টি ইউনিয়নে লাঠি হাতে অবস্থান ও ভোর থেকে রাজধানীর আটটি পয়েন্টে পাহারা দেবে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীরা যাতে রাজধানীতে ঢুকতে না পারে সে জন্য নেতা-কর্মীদের বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। রাজধানীতে একটি মাছিও ঢুকতে দেয়া হবে না। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, ‘মার্চ ফর ডেস্ট্রাকশন অব ডেমোক্রেসি’ করতে দেয়া হবে না।

টার্মিনালে যানসঙ্কট, যাত্রীদের অপেক্ষা
রাজধানীর প্রধান তিন টার্মিনাল সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালী থেকে দূরপাল্লার কোন বাস ছেড়ে যায়নি গতকাল ঢাকার বাইরে থেকে কোন বাস টার্মিনালেও আসেনি। টার্মিনালে গিয়ে অধিকাংশ বাস কাউন্টার বন্ধ পাওয়া যায়। শুক্রবার বিকাল থেকেই অনেক জেলা থেকে ঢাকামুখী বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে রাজধানী থেকেও ছেড়ে যাচ্ছে না কোন গণপরিবহন। রাজধানীর গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে শুক্রবার রাত থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। রাজধানীর মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে গতকাল সকাল থেকে কোন বাস ছেড়ে যায়নি। ঢাকার বাইরে থেকেও আসেনি। ৫০০টির মতো বাস ঠায় দাঁড়িয়ে আছে টার্মিনালে। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ১৮-দলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা যাতে বাস ভাড়া করতে না পারেন, সে জন্যও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কয়েকটি জেলায় মাইকিং করে বাস বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন সরকার-সমর্থক পরিবহন নেতারা। পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাজধানীর মিরপুরে এমপি আসলামুল হকের ভাই মফিজুল হকের বাসায় নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান পরিবহন শ্রমিক-মালিকদের ডেকে বৈঠক করেন। বৈঠক থেকে বাস না চালানোর নির্দেশ দেয়া হয়। একইভাবে পরিবহন মালিকদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও ধানমন্ডি আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বৈঠক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। ময়মনসিংহগামী শ্যামলী বাংলার চালক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, সরকারি ধর্মঘট না বিএনপির ধর্মঘট বুঝতেছি না। কাল বেলা তিনটায় রওয়ানা দিয়া ঢাকায় পৌঁছছি রাত সাড়ে ১১টায়। সকালে উইঠ্যা শুনলাম গাড়ি যাইবো না। তবে কাল প্রচুর মানুষ ঢাকায় আসছে। চার ঘণ্টার রাস্তা পারাইতে আট ঘণ্টা লাগছে। সোনার বাংলা পরিবহনের এক চালক বলেন, গাড়ির মালিকদের বেশির ভাগই সরকার দলীয় নেতা। বিরোধী দলের কর্মসূচি থাকায় তারা ইচ্ছে করে গাড়ি চালাচ্ছেন না। আরেক চালক লাল্টু খান বলেন, বিরোধী দলের কর্মসূচি থাকলেই শ্রমিক সংগঠনের নাম করে ধর্মঘট ডাকা হয়। মালিক সমিতির কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানান, নির্বাচনকালীন সময় পর্যন্ত বাস ‘রিক্যুইজিশন’ দেয়ার ভয়ে গাড়ি বন্ধ রাখা হয়েছে। তারা বলেন, পুলিশের জিম্মায় থেকেও গাড়ির ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। কার ভরসায় গাড়ি নামাবো রাস্তায়? ওদিকে সায়েদাবাদ থেকে কিশোরগঞ্জ ও আশেপাশের জেলার রুটে সকালে কিছু বাস ছেড়েছিল। তবে নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ থেকে বাসগুলো ফেরত পাঠানো হয়েছে। গাবতলীতে দক্ষিণাঞ্চলগামী এসপি গোল্ডেন লাইন বাস কাউন্টারের ব্যবস্থাপক আরিফুজ্জামান বলেন, রাতে যেসব গাড়ি যশোর-সাতক্ষীরা থেকে ছেড়েছে, সেগুলো ঢাকায় পৌঁছেনি। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরি চলাচল বন্ধ রাখায় ব্যক্তিগত মালিকানাধীন যানবাহনগুলোকে ঢাকা পৌঁছাতে হয়েছে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে। ঢাকা-বান্দুরা রুটের বাসের এক কর্মকর্তা বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলেছেন- নিরাপত্তার কারণে ২৮ ও ২৯শে ডিসেম্বর গাড়ি বন্ধ রাখতে। কিশোরগঞ্জের এক বাস মালিক বলেছেন, বাস না চালাতে মৌখিক নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে বাগেরহাট ও কক্সবাজারে শ্রমিকরা আকস্মিক ধর্মঘট ডেকে বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন। তবে বিএনপির অভিযোগ বাস চলাচল বন্ধ করতে সরকারের মদতে এই ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। বাসের মতো বাইরে থেকে লঞ্চও তেমন আসেনি ঢাকার সদরঘাটে। অন্যদিন সকালে ঢাকার প্রধান নৌবন্দরে অর্ধশত লঞ্চ দক্ষিণের জেলাগুলো থেকে ভিড়লেও গতকাল তার সংখ্যা ছিল মাত্র ১০টি। সদরঘাটে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ নাশকতার আশঙ্কায় লঞ্চ বন্ধ রাখার কথা বললেও এমভি টিপু লঞ্চের ব্যবস্থাপক  ফারুক হোসেনের অভিযোগ, পুলিশের তল্লাশির কারণে যাত্রী সংখ্যা কম। তাই লঞ্চ চলছে না।

তল্লাশি চৌকি, মহড়া
১৮ দলের আজকের কর্মসূচি মোকাবিলায় রাজধানীর প্রতিটি প্রবেশমুখসহ বিভিন্ন জেলায় চৌকি বসিয়ে তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি বিভিন্ন স্টেশনে অবস্থান নিয়ে পাহারা দিয়েছে সরকারদলীয় কর্মী-সমর্থকরা। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে ঢাকায় প্রবেশের মুখ সাভারের আমিনবাজার, রেডিও কলোনি, হেমায়েতপুর, সিংগাইর সেতু, ধামরাই, কালামপুর বাসস্ট্যান্ড, জিরানী বাসস্ট্যান্ড, বাইপাইল, জিরাব, আশুলিয়া বাজার ও নবীনগর বাসস্ট্যান্ড, বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড় গোল চত্বর, দক্ষিণাঞ্চল থেকে প্রবেশের মুখ মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুর সেতু, উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে প্রবেশপথ কাঁচপুর, রূপগঞ্জ ও নরসিংদীর মাধবদীসহ ঢাকা প্রবেশের নানা জায়গায় চৌকি বসিয়ে দিনভর তল্লাশি চালিয়েছে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ। এদিকে গাবতলীতে সড়কের এক পাশে চেয়ার পেতে অবস্থান নেয় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও শ্রমিক লীগের নেতারা। দারুস সালাম থানা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক আকতার হোসেন বলেন, বিএনপি যে কর্মসূচি দিয়েছে, সেটা ধ্বংসাত্মক। সেটা মোকাবিলার জন্য শান্তিপূর্ণভাবে এখানে অবস্থান করবো। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে জনগণকে সচেতন করবো।

Facebook Comments