শিবিরে সর্বস্বান্ত ছাত্রদল

0
13
Print Friendly, PDF & Email

গত ২৮ জানুয়ারি রাজধানীর মতিঝিলে সিটি সেন্টার ভবনের নিচতলায় পুলিশের ওপর এ রকম নৃশংস হামলা চালায় শিবির ক্যাডাররা। ফাইল ফটো
 
 
 
 
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলকে একসময় বলা হতো দলটির প্রধান শক্তি। আশির দশকে বিএনপিকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সাহস এবং মাঠের শক্তি জুগিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। বলা হয়ে থাকে, ছাত্রদলের ওপর ভর করেই বিএনপি ছিয়াশির নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।
কিন্তু এখনকার সরকারবিরোধী আন্দোলনে ভিন্ন চিত্রই দেখা যাচ্ছে। মাঠে থাকছে বিএনপির প্রধান মিত্র জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির, যাদের বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগ উঠছে বারবার। সেখানে ছাত্রদল হয়ে পড়েছে নামসর্বস্ব।
১৯৯২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের একজন শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সময়ে আমরা শিবিরকে সব সংগঠন মিলে দমিয়ে রেখেছিলাম। সেদিনের সঙ্গে তুলনা করলে আজকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের অবস্থা বলতে গেলে নাজুক।’
ছাত্রদল সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠনটির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এরপর আর কোনো সম্মেলন হয়নি, কোনো কমিটিও হয়নি। কালেভদ্রে তাদের তৎপরতা চোখে পড়ে।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়, আশপাশের এলাকা ও নগরীর প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিবিরের আধিপত্য স্পষ্ট। রাজশাহীতে চলতি বছর নানা নাশকতা, পুলিশ হত্যা, ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের রগ কাটাসহ নানা নৃশংসতায় তাদের নাম এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী সাইফুর রহমান মনে করেন, ছাত্রদলের ভেতরে থেকে সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করেছে শিবির। সরকারবিরোধী আন্দোলনে শিবির সেই খোলস ছেড়ে এসে তৎপরতা চালাচ্ছে। এ কারণে ছাত্রদল ও শিবিরের শক্তির পার্থক্যটা চোখে পড়ছে।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের সাবেক এ ছাত্র জানান, তাঁরা অন্তত তিনবার ওই হলে মৌলবাদী সংগঠন শিবিরের তৎপরতা দমনের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ছাত্রদলের বাধায় কোনোবারই সফল হননি।
বিএনপি-জামায়াত জোটের বিগত শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের তৎপরতা আবার বেড়ে যায়। এর পরিণতিতে ভেতরে ভেতরে ছাত্রদলের সঙ্গে সংগঠনটির শক্তির লড়াই শুরু হয়ে যায়। এমন তথ্য জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক একজন ছাত্রনেতা বলেন, ২০০৬ সালের ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা গোপনে তাঁদের ডেকে তালিকা ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০টি হলে শিবির তৎপরতা শুরু করেছে। যেহেতু ছাত্রদল প্রকাশ্যে শিবিরবিরোধী অবস্থান নিতে পারছে না, তাই শিবির হটানোর কাজটিই তাঁদের করার অনুরোধ জানান। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে শিবিরকর্মীদের ‘বিতাড়ন’ করা হয়, যাতে পরোক্ষ সমর্থন ছিল ছাত্রদলের।
আশির দশক থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবিরের হাতে খুন হয়েছেন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। এ দলটির বহু নেতার হাত-পায়ের রগ কেটে নিয়েছে শিবির। অনেকের হাতের কবজি কাটা গেছে জামায়াতের এ সহযোগী ছাত্র সংগঠনটির হাতে।
এ কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল, ছাত্রলীগ ও প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন মিলে শিবিরকে নিষিদ্ধ করেছে।
ছাত্রদলের সঙ্গে শিবিরের ‘শত্রুতার’ ভয়ংকর নজির রাজশাহী বিদ্যালয়। ১৯৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি শিবিরের সশস্ত্র কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হল দখল করে নেয়। এ দিনে শিবিরের গুলিতে নিহত হন ছাত্রদলের কর্মী বিশ্বজিৎ ও সাধারণ শিক্ষার্থী নতুন, ছাত্র ইউনিয়নের নেতা তপন, আমানুল্লাহ আমানসহ পাঁচজন। দুদিন পর নিহত হন ছাত্রদল কর্মী আমজাদ হোসেন। এ সবের ধারাবাহিকতায় শিবির ১৯৯৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস দখল করে নেয়। ছাত্রদলকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও হল থেকে বের করে দেয় তারা। অথচ তখন ক্ষমতায় বিএনপি। ২২ জুলাই ছাত্রদল ক্যাম্পাসে ফিরে এলে শিবিরকর্মীরা মাহবুবুল আলম ফরহাদ নামের এক নেতাকে কুপিয়ে পঙ্গু করে দেয়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে তৃতীয় ছাত্র ফরহাদ ছিলেন ওই হাবিবুর রহমান হল শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক। পরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক হন। সর্বশেষ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ওই ঘটনায় তিনি শিবির ক্যাডার শাহাদাৎ, জব্বার, সোহরাওয়ার্দী হলের সভাপতি তুষার, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মতিউর রহমান আকন্দ, সাধারণ সম্পাদক সেক্রেটারি নূরুল ইসলাম বুলবুল ওরফে মাইনুলসহ আরো অনেককে আসামি করে মামলা করেছিলেন। কিন্তু এ পর্যন্তই। মাইনুল বর্তমানে রাজশাহীর লক্ষ্মীপুর মোড়ে জমজম ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালক। শিবিরের আরেক ক্যাডার বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি জব্বার বর্তমানে যশোরে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালক। বিচার পাননি ফরহাদ।
ফরহাদ নিজের এলাকা ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে সংসদ নির্বাচন করতে আগ্রহী। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একদিন শুভ সময় আসবে। মানুষ জামায়াত-শিবিরকে প্রতিহত করবে।’
১৯৯৬ সালে জাতীয়তাবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আমান উল্লাহ আমানকে গ্রন্থাগারের সামনে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা।  একই ঘটনায় ছাত্রদল নেতা ডুপ্লের হাত-পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। হামলাকারীদের অন্যতম শিবির ক্যাডার শাহাদাত হোসেন বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে কর্মরত। এ ঘটনার বিচার পায়নি ভুক্তভোগীরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯৪ সালে শিবিরের হামলায় মারা যান ছাত্রদল নেতা নূরুল হুদা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরকে প্রতিহত করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী মৌলবাদী এ সংগঠনটির সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। ১৯৮৯ সালের ৩০ আগস্ট শিবিরের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ৩১ জনকে আহত করে। ওই বছরের শুধু জুন মাসেই আরো ১৪ জন ছাত্রদল নেতা-কর্মী শিবিরের হাতে আহত হন। ওই বছরের ২৯ আগস্ট জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলকর্মী হাবিব নিহত হন শিবিরের হামলায়।
দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠলে ১৯৯২ সালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সংসদে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব তোলে। কিন্তু ওই পর্যন্তই।
অভিযোগ রয়েছে, এরপর বিএনপির ছত্রচ্ছায়ায় জামায়াত ও শিবির শক্তি অর্জন করেছে ব্যাপকভাবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের একজন নেতা মহানগর বিএনপির কয়েকজন নেতাকে দায়ী করেছেন সেখানে শিবিরের উত্থানের জন্য।
এ বিষয়ে জানতে গতকাল দুপুরে রাজশাহী নগর সংস্থার সাবেক মেয়র ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনুকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বোমা হামলায় পুলিশ সদস্য সিদ্ধার্থ নিহত হওয়ার মামলায় আসামি করার পর থেকে তিনি আত্মগোপনে চলে গেছেন।
চট্টগ্রামের স্থানীয় একজন সাংবাদিক জানান, নগরীতে ছাত্রদলের তুলনায় শিবিরের আধিপত্যই বেশি। তিনি মনে করেন, চট্টগ্রাম কলেজ, মুহসীন কলেজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিবিরের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ছাত্রদল সুবিধা করতে পারছে না।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। ছাত্রলীগকে ঠেকাতে শিবিরের সঙ্গে জোট বেঁধেছিল সংগঠনটি। কিন্তু সম্প্রতি শিবির ছাত্রলীগের সঙ্গে আঁতাত করে ক্যাম্পাসে ফিরতে পারলেও ছাত্রদল বলতে গেলে ক্যাম্পাস ছাড়া।
শিবিরের সঙ্গে আঁতাতের বিষয়টি অস্বীকার করে কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি বিজয় সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আঁতাত করিনি। বরং দুই মাস আগের শিবিরের নেতারা ক্যাম্পাসে আর নাশকতা বা বিশৃঙ্খলা ঘটাবে না এমন মুচলেকা দিয়ে ফিরে এসেছে।’
ছাত্রদলের সঙ্গে শিবিরের আঁতাত এবং পরে ভেঙে যাওয়ার মতো ঘটনার বিষয়ে জানতে কলেজ ছাত্রসংসদের সাবেক সহসভাপতি মাসুদ রানাসহ কয়েকজনের সঙ্গে কালের কণ্ঠের চট্টগ্রাম অফিস থেকে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি সিলেটে শিবিরের মেস থেকে জব্দ করা তালিকায় সংগঠনটিকে আর্থিক সহায়তাদাতাদের নাম পাওয়া যায়। সেখানে নগর বিএনপির সহসভাপতি নোমান মাহমুদসহ কয়েকজনের নাম ছিল। তবে নোমান মাহমুদ বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছিলেন, তাঁর বাবা শিবিরকে চাঁদা দিয়ে থাকেন। কিন্তু শিবিরের নেতারা তাঁর নাম জানে না। সে কারণে শিবির তাদের তালিকায় বিএনপির এ নেতার নাম লিখে রেখেছে।

Facebook Comments