সাক্ষাৎকার : মওদুদীর ছেলে সৈয়দ হায়দার ফারুক আমার বাবা জামায়াতকে ড্রাগ মনে করতেন

0
7
Print Friendly, PDF & Email

জামায়াতে ইসলামের শীর্ষ স্থানীয় নেতারাই দলটির রাজনীতির সঙ্গে নিজেদের সন্তানদের যুক্ত হতে দেন না। এমনকি তাঁদের সন্তানদের মাদ্রাসার শিক্ষাও দেন না। এ অভিযোগ শুধু বাংলাদেশের জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধেই নয়, জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদীর বিরুদ্ধেও রয়েছে। তাঁর ৯ সন্তানের মধ্যে একজনকেও তিনি জামায়াত কিংবা এর ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করেননি। মওদুদীর সন্তানরা পড়েছেন পশ্চিমা আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায়। ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবিরের নির্মিত ‘জিহাদ উইদাউট বর্ডার’ নামের এক তথ্যচিত্রে উঠেছে এসেছে এ সত্য।
জানা যায়, ‘জিহাদ উইদাউট বর্ডার’ তথ্যচিত্রে একটি সাক্ষাৎকার দেন আবুল আলা মওদুদীর ছেলে সৈয়দ হায়দার ফারুক মওদুদী। ওই সাক্ষাৎকারে ধর্মীয় রাজনীতির নামে জামায়াতের ভণ্ডামীর নানা ঘটনা তুলে ধরেন মওদুদীপুত্র।
তথ্যচিত্রে সৈয়দ হায়দার ফারুক বলেন, “আমার বাবা আবুল আলা মওদুদী জামায়াতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু আমার কোনো ভাইবোন জামায়াত বা এর ছাত্র সংগঠন তুলাবা ইসলামিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকেননি। আমাদের পরিবারের সদস্যরা জামায়াত ও তার ছাত্র সংগঠনের ধারে-কাছেও যায়নি, এমনকি আমরা সমর্থকও ছিলাম না। যদি আমার বাবা জামায়াতের কোনো মিটিংয়ের আশপাশে আমাদের দেখতেন তখন তিনি আমাদের বলতেন, ‘তোমরা এখানে এসেছ কেন?’ তিনি সব সময় আমাদের জামায়াত থেকে দূরে রাখতেন। তিনি জামায়াত থেকে সব সময় এমনভাবে আমাদের আলাদা রাখতেন যেন জামায়াত ইসলাম হেরোইনের মতো ড্রাগ। আর ড্রাগ ভরা এ ব্যাগ বাড়ির বাইরে কোথাও লুকিয়ে রাখতে হবে। বাবা তাঁর সব রাজনৈতিক দর্শন বাড়ির সদস্যদের থেকে দূরে রাখতেন।”
মওদুদীপুত্র হায়দার ফারুক আরো বলেন, ‘আমরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়েছি। আমাদের সঙ্গে জামায়াতের রাজনীতির কোনো সম্পর্ক ছিল না। আমাদের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনের কোনো সময় জামায়াত অথবা তার ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। এমনকি জামায়াতকে আমরা ভালো রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবেও মনে করতাম না। কারণ তাদের ভণ্ডামি আমরা কাছ থেকেই দেখেছি।’
সৈয়দ হায়দার মওদুদী তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেন, “একদিন মাওলানা আজাদ আমাদের এখানে আসেন। তিনি আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি শুনেছি তুমি নাকি একটি ইসলামিক পার্টি গঠন করতে যাচ্ছ?’ বাবা উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বললে মাওলানা আজাদ জামায়াতে ইসলামের খসড়া গঠনতন্ত্র দেখতে চান। খসড়া গঠনতন্ত্রটি মাওলানাকে দেওয়া হয়। তিনি তা পড়েন এবং এ বিষয়ে পরে আলাপ করবেন বলে বাবাকে জানান। মাওলানা আজাদ দুই দিন পর আবার ফিরে আসেন। তিনি আমার বাবাকে জামায়াতের গঠনতন্ত্র সম্পর্কে বলেন, ‘এর আলোকে পার্টি গঠন করা হলে এটি একটি ফ্যাসিবাদী পার্টি হবে। আমি তোমাকে অনুরোধ করছি, তুমি জামায়াতে ইসলামী তৈরি করার চিন্তা বাদ দাও। এসব অপ্রয়োজনীয় কাজ। আমি বিভিন্ন সময় অনেক কিছু করার চেষ্টা করেছি। এমনকি বেড়াল-কুকুরও এক সঙ্গে থাকে। কিন্তু ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো কখনো এক হয় না। তুমি তাদের ঐক্যবদ্ধ করে কিছুই করতে পারবে না।’”
মওদুদীর পরতে পরতে ছিল ভণ্ডামি আর চাতুর্য। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ে ওঠে ১৯৪৭ সালে। এ সময় পাকিস্তানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলেন মওদুদী। এ প্রসঙ্গে তাঁর ছেলে বলেন, “আমার বাবা পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছিলেন। পাকিস্তানের ব্যাপারে আমার বাবা বলতেন, ‘পাকিস্তান একটি নাপাক, অপবিত্র ভূমি।’ কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সম্পর্কে তিনি বলতেন, ‘যে তাঁর ছয় ফুটের শরীরে ইসলাম কায়েম করতে পারে না, সে কি করে সারা দেশে ইসলাম কায়েম করবে?’ কিন্তু পাকিস্তান কায়েম হওয়ার পর সুর পরিবর্তন করে ফেলে তিনি বলেন, ‘আমরাই পাকিস্তান বানিয়েছি।’ আল্লামা ইকবাল, জিন্নাহ ও মাওলানা মওদুদী পাকিস্তান বানিয়েছেন।”

পাকিস্তানে তালেবানদের বিস্তার প্রসঙ্গে সৈয়দ হায়দার মওদুদী বলেন, ‘একটা সময় আফগানিস্তানে রাশিয়ার অবৈধ অনুপ্রবেশের অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্রও সেখানে তাদের নাক গলাতে শুরু করে। ওসামা বিন লাদেনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই তৈরি করেছে। লাদেন মার্কিনিদের কেনা গোলাম ছিল। এখানকার সব ধর্মীয় গ্রুপ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়ায়। কিন্তু আফগানিস্তানের জেহাদ শেষ হওয়ার পর জামায়াতের আমির (১৯৭২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত) মিয়া তোফায়েল মোহাম্মদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, কী ঘটতে পারে সে সম্পর্কে আমাদের ধারণা না থাকার কারণে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছি।’ তবে বিষয়টি কেবলই না জানার নয় বলে মন্তব্য করেন মওদুদীপুত্র। তিনি বলেন, প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে সে সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে অজস্র ডলার নিয়েছে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলাম। এই ডলারের জোরেই সব জেনে-বুঝেও তারা চোখ ও মুখ বন্ধ রেখেছিল।

Facebook Comments