উৎকণ্ঠায় শুরু নতুন বছর অধরাই থাকল সমঝোতা

0
4
Print Friendly, PDF & Email

 
আতঙ্কের একটি বছর পার হলো গতকাল, আর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে আজ শুরু হচ্ছে নতুন বছর। বিরোধী দলের পাঁচ দফা অবরোধের হাত ধরে দেশজুড়ে নাশকতায় খানিক বিরতি ঘটতেই শুরু হয় অভিনব ‘সরকারি অবরোধ’। এসবের রেশ না কাটতেই নতুন বছরের প্রথম দিন আজ শুরু হচ্ছে বিরোধী দলের টানা সড়ক-রেল-নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি। অবরোধের আতঙ্কের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে অজানা আশঙ্কা। এ নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে গত বছরের রাজনীতি। এর অসিলায় সহিংসতা অতীতের সব দৃষ্টান্তকে হার মানিয়েছে। সরকার ও বিরোধী রাজনীতির জন্য ২০১৩ ছিল সবচেয়ে কঠিন বছর। বছরটি শেষ হলো নিরাশার আঁধারে।
সংলাপ, সমঝোতা আর সংবিধান- এই তিন কথায় বছরজুড়ে ঘুরছিল রাজনীতি। ফোনে কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা, দেশি-বিদেশি জনমতের চাপে সংলাপে বসলেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা। তা দেখে সমঝোতার স্বপ্নে ভেসেছে দেশের মানুষও। সরকারি দল সংলাপের মাধ্যমে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজনে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা চেয়েছে। আর বিরোধী দল চেয়েছে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতার ভিত্তিতে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন। বছরের শুরুর দিকে সংবিধানকেন্দ্রিক সংলাপের সম্ভাবনা না থাকলেও সমঝোতার আশা ছিল অনেকের মধ্যেই। কিন্তু বছর যতই শেষের দিকে এগিয়েছে, সংলাপের সম্ভাবনা ক্ষণে ক্ষণে বাড়লেও সমঝোতার সম্ভাবনা কমেছে। সমঝোতার শেষ চেষ্টার কবর হয়েছে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর বিদায়ের দিনকয়েক পর, যেদিন প্রধানমন্ত্রী দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে সমঝোতার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচনের কথা বলেন। ওই ঘোষণার আগে ও পরে নিজস্ব স্বার্থ ঠিক রেখে সংলাপ আর সমঝোতা চেয়ে দুই দলের আন্দোলন, আর তা ঠেকানোর কৌশলের মাঝে পড়ে অনেক প্রাণহানি ঘটেছে। হরতাল-অবরোধে ধ্বংসযজ্ঞ হলেও সমঝোতার সন্ধান আর মেলেনি।
২০১৩ সালের প্রথম দিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছিলেন, সংলাপ ও সমঝোতার মধ্যেই গণতন্ত্র ও জাতির মঙ্গল। তাই যত দ্রুত সম্ভব আলোচনার মাধ্যমে  সমস্যার সমাধান করা দরকার। কয়েক দিন পর ১১ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাফ জানিয়ে দেন, নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে সংবিধানের বাইরে তিনি যাবেন না। তখন থেকেই নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সন্দেহ বাড়তে থাকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ভেতরে। এরই মধ্যে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশের পর ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে গণজাগরণ মঞ্চের উত্তাল দিনগুলোতে চাপা পড়ে যায় নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সংলাপ, সমঝোতার বিষয়টি। ওই সময় জামায়াত নেতার ফাঁসির দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চকে সমর্থন দেওয়া, না দেওয়া নিয়ে বেকায়দায় পড়ে সরকার। তবে ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয়ার্ধে গণজাগরণ মঞ্চের আওয়ামীকরণ হওয়ার পর বেকায়দা অবস্থান থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পায় দলটি। এরই মধ্যে ৮ মার্চ চট্টগ্রামে সমাবেশ করে গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তি জাহির করে হেফাজতে ইসলাম। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনটির প্রতিরোধের ঘোষণার মুখে ১১ মার্চ চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করে ফেনী থেকে ফিরে আসেন গণজাগরণ মঞ্চের নেতারা। এ সময়ে কয়েক দিনের জন্য রাজনীতিবিদদের মুখ থেকে উধাও হয়ে যায় সংলাপ, সমঝোতা আর সংবিধানের বাণী।
প্রতিবেশী ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ঢাকা সফরকালে নিরাপত্তাহীনতার কথা বলে ৩ মার্চ হরতালের দিনে তাঁর সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল করায় আবারও সমালোচনার মুখে পড়তে হয় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার পেছনে এ ঘটনা নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করেন অনেকে। গত বছরে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ছাড়া শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বেশির ভাগকেই কারাগারে যেতে হয়েছে। গাড়ি পোড়ানো মামলায় বেশির ভাগ নেতা কারাগারে ঢুকলেও তাঁদের ওপর প্রথম খক্ষ নেমে আসে হঠাৎ ফাটা ককটেলে। ১১ মার্চ নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ চলাকালে হঠাৎ কয়েকটি ককটেল ফাটার ঘটনায় ওই দিন কার্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষের তালা ভেঙে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সাদেক হোসেন খোকা, রুহুল কবীর রিজভী, আমানউল্লাহ আমানসহ শতাধিক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ১৫ মার্চ মুন্সীগঞ্জে আয়োজিত এক সমাবেশে খালেদা জিয়া সমঝোতার মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন করার দাবির পাশাপাশি গণজাগরণ মঞ্চ বন্ধেরও দাবি জানান। না হলে পাল্টা মঞ্চ করার ঘোষণা দেন তিনি।
২০ মার্চ প্রবীণ রাজনীতিক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান মৃত্যুবরণ করেন। পরদিন দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার একই ছাদের নিচে আসার সুযোগ হয়। বঙ্গভবনে দুই নেত্রী ৩০ মিনিট অবস্থান করলেও তাঁদের মধ্যে দেখা হয়নি, কথাও হয়নি। এ অবস্থায় পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষে উত্তরের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক প্রাণহানির পরিপ্রেক্ষিতে ২৪ মার্চ বগুড়া ও জয়পুরহাটে জনসভায় খালেদা জিয়া বলেন, সেনাবাহিনী নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারে না। অবশ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত ওই বক্তব্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে পরে বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে দুই দলের পাল্টাপাল্টি অবস্থান, গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন আর জামায়াতের সহিংসতা- সব কিছুকে পিছনে ফেলে আলোচিত হয়ে ওঠে হেফাজতে ইসলাম। সংগঠনটির ৬ এপ্রিল শুক্রবারের লংমার্চের দিনে সরকার সমর্থক বিভিন্ন সংগঠন হরতাল ডেকে হাসির খোরাক জোগায়। শুক্রবারে হরতাল ডাকার নজির ছিল না বাংলাদেশে। তবে সেই হরতাল নিয়ে আলোচনা স্থায়ী হতে দেয়নি হেফাজতের সমাবেশে কর্মীদের বিপুল উপস্থিতি। সেখান থেকে ১৩ দফা দাবি জানায় হেফাজত।
সংবিধান পরিবর্তন করে নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা আরো ফিকে হয় ৩ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথায়। ওই দিন সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য সব দলের প্রতিনিধি নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করলে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। পরদিন ৪ মে নয়াপল্টনের সমাবেশে খালেদা জিয়া সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়ে বলেন, ওই সময়ের মধ্যেই নির্দলীয় সরকারের দাবি মানতে হবে। দুই নেত্রীর বিপরীতমুখী অবস্থান ছাপিয়ে আবারও আলোচনায় আসে হেফাজত। ৫ মে ঢাকার মতিঝিলে সমাবেশ করতে এসে শত শত গাছ কাটা, গাড়ি, ভবন পোড়ানো, রাস্তার ডিভাইডার উপড়ে ফেলা, কোরআন শরিফ পোড়ানো- নাশকতার কোনো কিছুই বাদ রাখেনি তারা। ওই দিন হেফাজতের তাণ্ডবে বিজিবি, পুলিশ, ডিজিএফআইয়ের সদস্যসহ পাঁচজন নিহত হন। পরে রাতে যৌথ বাহিনীর অভিযানে হেফাজতকর্মীরা ঢাকা ছাড়লে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। তবে কয়েক দিন ধরেই দেশজুড়ে আলোচনায় ছিল তারা। মাঠের রাজনীতিতে বারবার বেকায়দায় পড়া বিএনপি সমর্থক প্রার্থীরা ১৫ জুন সিলেট, রাজশাহী ও খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর চাঙ্গা হয়ে ওঠে দলটি। নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে জয় অবধারিত ভেবে তখন থেকে সমঝোতার ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন বিএনপির নেতারা।
সংসদের বাজেট অধিবেশনে ২৯ জুন প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা দুজনই বক্তব্য দেন। ওই দিন খালেদা জিয়া বলেন, এখনো সময় আছে, সমাধানের উদ্যোগ নিন। না হলে সরকারকে মানতে বাধ্য করা হবে। খালেদা জিয়ার ওই দাবি তাৎক্ষণিকভাবে নাকচ করে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচন গণতান্ত্রিক দেশের মতোই হবে। ৬ জুলাই গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পূর্ণ শক্তি নিয়ে মাঠে নামার পরও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী জয়ী হওয়ার পর বেশ নিরাশ হয়ে পড়েন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। ওই ঘটনার রেশ না কাটতেই নারীকে তেঁতুলের সঙ্গে তুলনা করে হেফাজতের আমির আল্লামা শফীর ওয়াজ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় রাজনীতির মাঠেও। আর ২৪ জুলাই বর্তমান সরকারের সংসদ সদস্য হয়েও গ্রেপ্তার হন গোলাম মওলা রনি।
আগস্ট মাস থেকেই নির্বাচনী কর্মকাণ্ড, প্রচারণা শুরু করে আওয়ামী লীগ। এরই অংশ হিসেবে রাজধানীর বিভিন্ন বিলবোর্ড দখল করে সরকারের উন্নয়নকর্মের প্রচার চালাতে থাকে দলটি। এ ঘটনার সমালোচনার মধ্যে ১৮ আগস্ট গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সংবিধান থেকে একচুলও নড়ব না, ব্যস।’ ১৯ আগস্ট শেখ হাসিনার ওই বক্তব্যের সমালোচনায় খালেদা জিয়া সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার সময় দিয়ে বলেন, ‘এত আস্ফালন ভালো নয়। বাতাসে চুল উড়ে যাবে।’
দুই নেত্রীর বিরুদ্ধ অবস্থানের মধ্যে ২৩ আগস্ট তাঁদের টেলিফোন করে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর অনুরোধ করেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। তাঁর ওই টেলিফোনের পর সাধারণ মানুষের মনে সমঝোতার আশা জাগলেও দুই নেত্রী আগের অবস্থানেই অনড় থাকেন। ওই অবস্থার মধ্যে ২৬ আগস্ট হঠাৎ করেই দুই দলের মধ্যে সমঝোতায় দূতিয়ালির উদ্যোগ নিতে চান নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর ওই উদ্যোগকে বিএনপি স্বাগত জানালেও হাস্যকর বলে উড়িয়ে দেয় আওয়ামী লীগ।
৮ সেপ্টেম্বর নরসিংদীর জনসভায় খালেদা জিয়া বলেন, হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার আনতে হবে, না হয় শেখ হাসিনাকে বিদায় নিতে হবে। এর এক মাস পর ৮ অক্টোবর চীনের রাষ্ট্রদূত লি জুনের সঙ্গে বৈঠকে দুই দলের মহাসচিব পর্যায়ে সংলাপের প্রস্তাব করেন খালেদা জিয়া। কিন্তু ১৮ অক্টোবর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়ে বিরোধী দলের কাছে প্রতিনিধিদের নাম চান। ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি যাতে আন্দোলন করতে না পারে সে জন্য পরদিন থেকে রাজধানীতে ঘরে-বাইরে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে পুলিশ। সরকারের এ উদ্যোগ বেশ সমালোচিত হয় সব মহলে। পরে ২১ অক্টোবর খালেদা জিয়া ১৯৯৬ ও ২০১১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে দুই দলের পাঁচজন করে উপদেষ্টা ও একজন সম্মানিত নাগরিককে প্রধান উপদেষ্টা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করেন। পরদিন সংলাপের আয়োজন করতে সৈয়দ আশরাফকে চিঠি দেন মির্জা ফখরুল। চিঠি পেয়ে ফখরুলকে ফোন করে কথা বলেন আশরাফ। তখন সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতার আশা আবারও করতে শুরু করেন অনেকে।
২৫ অক্টোবর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনের সমাবেশ থেকে সরকারকে সংলাপ ডাকার তাগিদ দেন খালেদা জিয়া। না হলে তিন দিনের হরতাল পালনের ঘোষণা দেন তিনি। পরদিন খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করেন শেখ হাসিনা। চার বছর পর দুই নেত্রীর ওই কথোপকথনে সমঝোতা তো নয়ই, বরং আগের বৈরী সম্পর্ক আরো তিক্ত হয়।
এরই মধ্যে ৪ নভেম্বর মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর সমঝোতার আশা আরো ক্ষীণ হতে থাকে। কিন্তু ১৭ নভেম্বর খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান অর্থপাচার মামলার রায়ে খালাস পাওয়ায় কেউ কেউ আবার সমঝোতার আশা করতে থাকেন। কিন্তু ওই দিনই জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিনিধিদের নিয়ে সর্বদলীয় সরকার শপথ গ্রহণ করায় সন্দেহও বাড়ে। ওই রাতেই খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে দেখা করে সংলাপ-সমঝোতার ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আসেন। পরে ২৩ নভেম্বর আশরাফ-ফখরুলের মধ্যে গুলশানে একটি বৈঠক হওয়ার খবর আবারও আশাবাদী করে অনেককে। কিন্তু ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের দিনক্ষণ ঠিক করে ২৫ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার পর ভেস্তে যায় সমঝোতার সব উদ্যোগ। দুই দলের বিপরীতমুখী অবস্থানের মধ্যে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে হঠাৎ করেই রাজনীতি গরম করে তোলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। দিনকয়েক ধরে এরশাদকে নিয়ে নানা নাটক চলতে থাকে জাতীয় পার্টি ও সরকারের মধ্যে। পরে মধ্য রাতে সিএমএইচ হাসপাতালে এরশাদকে নিয়ে যায় র‌্যাব। দলের কোনো কোনো নেতা তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করেন, আবার কেউ বলেন, তিনি চিকিৎসাধীন। এ অবস্থার মধ্যেই রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির কিছু নেতা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন, আবার এরশাদের হুকুম মেনে কেউ কেউ বর্জন করছেন। এরশাদ নাটকের মধ্যে শেষ দফা চেষ্টার প্রতিজ্ঞা নিয়ে ৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আসেন তারানকো। দুই শীর্ষ নেত্রী, সুধীসমাজের নেতা ও কূটনীতিকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকের পর দুই দলের নেতাদের সংলাপে বসাতে পারার তৃপ্তি নিয়ে ১১ ডিসেম্বর ঢাকা ছাড়েন তিনি। তারানকোর বিদায়ের পরও আশরাফ ও ফখরুলের নেতৃত্বে সমঝোতার জন্য সংলাপের সভা হয়েছে। সভায় কে, কাকে কী শর্ত দিয়েছে, তা না জানিয়ে উভয় পক্ষই বলেছে, তারা দলীয় শীর্ষ ফোরামে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত জানাবে। এর পরই আওয়ামী লীগ দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে সংলাপে বসার অনীহার কথা জানিয়ে পরের নির্বাচনের জন্য সমঝোতার সংলাপে বসার আগ্রহের কথা জানায়। আর বিএনপি বলে, একাদশ নয়, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল করে দশম সংসদ নির্বাচন নিয়েই সমঝোতা করতে হবে। বিএনপি তার দাবিতে গত ২৯ ডিসেম্বর ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ ঘোষণা করে। কিন্তু পুলিশ ও সরকারি দলের কর্মী-সমর্থকদের বাধায় তা পণ্ড হয়ে যায়। নয়াপল্টনে যেতে চেয়েও বের হতে পারেননি খালেদা জিয়া। আওয়ামী লীগ অবশ্য বলেছে, বিরোধীদলীয় নেতা নয়াপল্টনে যেতেই চাননি।
বছর শেষ হলেও সংলাপ, সমঝোতা আর সংবিধান বিষয়ে মতপার্থক্য একটুও কমেনি প্রধান দুই দলের, বরং বেড়েছে। এ সময়ে দাবি আদায়ের আন্দোলন ও তা প্রতিহত করার প্রতিজ্ঞার মধ্যে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে কয়েক শ মানুষ। গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয়েছে ৫০৭ জন। এ সময়ে দেশে ৮৪৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। তাতে আহত হয়েছে ২২ হাজারের বেশি মানুষ। রাজনৈতিক সহিংসতায় ৯৭ জন আগুনে পুড়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়, এদের মধ্যে ২৫ জন মারা গেছে।  

Facebook Comments