হরতাল-অবরোধে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি লক্ষ কোটি টাকা

0
10
Print Friendly, PDF & Email

অসহিষ্ণু রাজনীতির খক্ষ পড়ছে ব্যবসায়ীদের কাঁধে। ফুটপাতের ভাসমান দোকানি থেকে শুরু করে শীর্ষ ব্যবসায়ী- সবাইকে নিতে হচ্ছে এর দায়। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের বিরোধে ২০১৩ সালে ৭০ দিন হরতাল-অবরোধ হয়েছে। নতুন বছরের প্রথম দিন থেকেও চলছে অবরোধ। দুই দলের শক্তি ও পাল্টা শক্তি দেখানোর এই লড়াইয়ে লক্ষ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে কয়েকটি খাতের ব্যবসায়ীদের। এই হিসাবের বাইরে রয়েছে কৃষি খাত। হরতাল-অবরোধে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পারায় কৃষক সর্বস্বান্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে আছে দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশের ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ের বাড়তি ব্যয় ও আর্থিক ক্ষতি। ফলে এক বছরের হরতাল-অবরোধের ক্ষতি আগামী কয়েক বছরেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাংঘর্ষিক রাজনীতির নির্মম দায় সরাসরি এসে পড়ছে ব্যবসায়ীদের কাঁধে। প্রতিদিনই নগদ লোকসান গুনতে হচ্ছে তাঁদের। এতে ভ্রুক্ষেপ নেই রাজনীতিবিদদের। কারণ মাস শেষে শ্রমিকের মজুরি তাঁদের গুনতে হয় না। ঋণের কিস্তি পরিশোধের দায়ও নেই তাঁদের। ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির দায় একই সঙ্গে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপরও। হরতাল-অবরোধে পুঁজি হারাতে বসা ব্যবসায়ীরা বারবার ধরনা দিয়েছেন রাজনীতিবিদদের দুয়ারে। সাদা পতাকা মিছিল, মানববন্ধন করলেন; কিন্তু কোনো ফল হলো না। নিরাপত্তা নিয়ে হরতাল-অবরোধে একদিকে যেমন যান চলছে না, অন্যদিকে জরুরি প্রয়োজনে কোথাও যেতে কয়েক গুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে প্রত্যেককে। বড় চাকরিজীবী থেকে শুরু করে দিনমজুর প্রত্যেককেই নিতে হচ্ছে এই সহিংস রাজনীতির দায়।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, হরতাল-অবরোধসহ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সরাসরি আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি অর্থনীতির সম্ভাবনাগুলোকে নষ্ট করে দিচ্ছে। এর ক্ষতিও কম নয়।
গত ২২ ডিসেম্বর কালের কণ্ঠকে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘টানা অবরোধে দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমন সহিংসতা মেনে নেওয়া যায় না। গত দুই মাসে যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ করা সম্ভব নয়। কারণ, ধ্বংস করা সহজ, গড়া খুবই কঠিন।’
এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বিশ্বমন্দার মধ্যেও আগের বছরগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে। তবে এ বছর তাতে মন্দা। সাম্প্রতিক সহিংসতায় ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। বেশির ভাগ খাত এখন লোকসানের মুখে।
২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে গত ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬২ দিন হরতাল-অবরোধ হয়েছে দেশে। এ হিসাব তুলে ধরে দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই বলেছে, এতে লক্ষ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বিভিন্ন খাতে। ২১ ডিসেম্বরের পরও সরকার ও বিরোধী দল মিলে আজ পর্যন্ত আরো ১০ দিন অঘোষিত ও ঘোষিত অবরোধ পালন করেছে। ফলে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বেড়েছে। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় বিনিয়োগ কমেছে। ব্যাংকগুলোতে অলস টাকা জমছে। আর ব্যবসা-বাণিজ্যের বেশির ভাগ খাতই এখন লোকসানে রয়েছে। ফলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। সার্বিকভাবে বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানি, উৎপাদন-বিপণন কমায় রাজস্ব আদায় পরিস্থিতিও মুখথুবড়ে পড়ছে। অস্থির রাজনীতিতে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিস্থিতিও হতাশাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে সার্বিকভাবে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ব্যাহত হচ্ছে।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত এক বছরের হরতাল-অবরোধে বড় কয়েকটি খাতে লক্ষ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে। ক্ষমতা নিয়ে রাজনীতিবিদদের মারামারির দায় ব্যবসায়ীদের বহন করতে হচ্ছে। এত এত ক্ষতির পরও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনো টিকে আছে। শিগগিরই রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান না হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে ভয়াবহ ধস নামবে। আর ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি হরতাল-অবরোধে দেশের প্রায় সব ব্যক্তি ও পরিবারের আয় যেমন কমছে, তেমনি ব্যয় ও অপচয় বাড়ছে। এসব ধরলে সহিংস রাজনীতির ক্ষতির পরিমাণ কয়েক লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।’
এফবিসিসিআইয়ের সঙ্গে ঢাকা চেম্বার ও ইন্টারন্যাশনাল চেম্বারের হিসাব অনুযায়ী, এক দিনের হরতালে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১৫৪০ কোটি থেকে ১৬০০ কোটি টাকা। এ হিসাবে ৭২ দিনের হরতাল-অবরোধে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এক লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকার মতো। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্ষয়ক্ষতির যে পরিসংখ্যান সংগঠনগুলো করেছে, তা আগের হরতালগুলো বিবেচনায় নিয়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের হরতাল ও অবরোধগুলোতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেক বেশি স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে ব্যবসা খাতে ক্ষতি আরো বেড়েছে।
হরতাল ও অবরোধে বড় কয়েকটি খাতের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে এফবিসিসিআইয়ের প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক বহির্ভূত ৩১ আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরও আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে এবারই প্রথম রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারছে না এনবিআর। নভেম্বর পর্যন্ত সংস্থাটি ৪০ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে, যা লক্ষ্যমাত্রা থেকে ছয় হাজার কোটি টাকা পেছনে। চট্টগ্রাম বন্দরসহ মংলা সমুদ্রবন্দর ও দেশের বিভিন্ন স্থলবন্দরে পণ্য আনা-নেওয়া না হওয়ায় প্রতিদিনই বিপুল পরিমাণ লোকসান গুনতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের চিনিকলগুলো চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি উৎপাদনে সক্ষম- তাই বেশকিছু শর্ত পূরণের পর চিনি রপ্তানির সুযোগ দিয়েছে সরকার। কঠিন সেই শর্তগুলো পূরণের পরও শুধু হরতাল-অবরোধের কারণে সিটি গ্রুপ পাঁচ হাজার টন চিনি রপ্তানি করতে পারছে না। রাজধানীসহ শহরের দোকানগুলোতে যেমন পাস্তরিত দুধের সংকট দেখা দিয়েছে, তেমনি দুগ্ধবাজারজাত কম্পানিগুলো সরবরাহ করতে না পারায় দুধ কেনাই বন্ধ রেখেছে। বাজারজাত করতে না পারায় মিল্কভিটা প্রতিদিন গড়ে দুই কোটি ২৫ লাখ টাকা লোকসান গুনছে। এর মধ্যে গরুর খামারিদের ক্ষতি দৈনিক এক কোটি ২৫ লাখ টাকা। অবরোধ ও হরতালের সময় প্রাণ গ্রুপও প্রতিদিন দেড় লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করা থেকে নিজেদের বিরত রাখছে। ফলে এ গ্রুপটির সঙ্গে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে খামারিরাও।
এমন ক্ষতি সব খাতের, সব কম্পানিকেই বহন করতে হচ্ছে। বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পরিবহন খাত। হরতাল ও অবরোধের খড়গ সরাসরি এসে পড়ে এ খাতের ওপর। শুধু এক দিন গাড়ি না চললেই এ খাতের মালিকদের ক্ষতি হয় আড়াই শ কোটি টাকা। এই ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও পেট্রল পাম্প মালিকদের ব্যবসাও। সিএনজি ফিলিং স্টেশন মালিকদের সংগঠনের হিসাবে, এক দিন বন্ধ রাখলে তাদের তিন শ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়। পেট্রল পাম্পগুলোর ক্ষতিও কম-বেশি এ রকমই। এককভাবে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের উৎস তৈরি পোশাক শিল্প। এ খাতের মালিকরা জানিয়েছেন, শুধু নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের হরতাল-অবরোধেই তাঁদের ক্ষতি হয়েছে আট হাজার কোটি টাকার মতো। একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিকাশমান পোলট্রি, চামড়া শিল্পসহ ছোট-বড় সব ধরনের ব্যবসায়ীরা। হরতাল-অবরোধে বড় ব্যবসায়ীরা কারখানার গেট বন্ধ রেখে উৎপাদন চালাতে পারলেও, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সে উপায় নেই। দেশের প্রায় ২০ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর এক দিনে ক্ষতি হয় ৭৫০ কোটি টাকা।
ঢাকার তালতলার ফুটপাতে ছোট্ট একটি দোকান নিয়ে চা, সিগারেট, বিস্কুট আর কেক বিক্রি করেন রমজান আলী। তিনি বলেন, ‘আগে দৈনিক চার-পাঁচ হাজার টাকা বিক্রি হতো। এক হাজার টাকা লাভ হতো। তাতে সংসার ভালোই চলত। এখন সারা দিনে হাজার টাকার মতো বিক্রি হয়। তাতে দু-তিন শ টাকা লাভ হয়। তাই রাগ করে সোমবার দোকানই খুলিনি। কিন্তু ওই দিন দেখি নিজের পকেট থেকে দুই শ টাকা খরচ হয়ে গেছে। তাই এখন বাধ্য হয়ে দোকান খুলি। কারণ, সারা দিন দোকানে থাকলে দোকানের চা, পানি, বিস্কুট খাই, বাড়তি খরচ হয় না। কিন্তু এভাবে আর কিছুদিন চললে দোকান করার মতো পুঁজিই থাকবো না।’

Facebook Comments