টানা অবরোধ দুর্ভোগ সত্ত্বেও ট্রেনই ভরসা দূরপাল্লার ৩৫১ রুটে বাস চলাচল বন্ধ

0
5
Print Friendly, PDF & Email
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের অনির্দিষ্টকালের অবরোধের দ্বিতীয় দিন গতকাল বৃহস্পতিবার সারা দেশের সঙ্গে রাজধানীর সড়ক যোগাযোগ বন্ধ ছিল। ফলে ট্রেনের ওপর চাপ বেড়ে যাওয়ায় দিনভর রেলওয়ে স্টেশনগুলোতে ছিল ‘টিকিট নেই, টিকিট নেই’ রব। এর পরও ট্রেনই ছিল শেষ ভরসা।
পরিবহন মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, দূরপাল্লার ৩৬১টির মধ্যে ৩৫১টি রুটেই যাত্রী ও পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল করেনি। সরকার পুলিশ পাহারায় দূরের বাস চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেও হাতে গোনা কয়েকটি রুটে স্বল্প দূরত্বের বাস চলাচল করেছে। নিরাপত্তার অভাবে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা রাস্তায় দূরপাল্লার গাড়ি নামাচ্ছেন না। ট্রেন চলাচল করলেও সময় বিপর্যয়ের কারণে ট্রেনগুলো দুই থেকে সাত ঘণ্টা দেরিতে ছেড়েছে।
রাজধানীর সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল রুটে ১০০-১২০টি বাস চলাচল করেছে। মহাখালী বাস টার্মিনাল পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক আজিজুল হাকিম জানান, মহাখালী বাস টার্মিনাল
 থেকে বাস ছেড়েছে পুলিশ পাহারায়। তবে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল শ্রমিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. নাসির উদ্দিন হাওলাদার জানান, সায়েদাবাদ থেকে আলাদা পুলিশ পাহারা দেওয়া হয়নি।
গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়নি। শ্যামলী পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘নিরাপত্তার অভাবে আমরা গাড়ি চালাতে পারিনি। পাটুরিয়াসহ কাছের কয়েকটি রুটে কিছু গাড়ি চলাচল করেছে। ৮০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরের পথ পাড়ি দেওয়ার ক্ষেত্রে গাড়িচালকরা কোনো ভরসা পাচ্ছেন না। গাড়িতে নাশকতা অব্যাহত থাকায় দূরের বাসগুলো চলাচল করছে না।’
বাস না পেয়ে যাত্রীরা ছুটেছে ট্রেনের আশায়। কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে সকাল থেকেই ছিল যাত্রীদের প্রচণ্ড ভিড়। তবে সময়সূচিতে বিপর্যয়ের কারণে স্টেশনগুলোয় যাত্রীদের দুঃসহ দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে।
রেলওয়ে লালমনিরহাট বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দিনাজপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ঢাকাগামী একতা এক্সপ্রেস ট্রেনটি গতকাল রাতে ১১ ঘণ্টা ২০ মিনিট দেরিতে কমলাপুর স্টেশনে ঢোকে। ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া লালমনি এক্সপ্রেস গতকাল রাত সোয়া ৭টায় লালমনিরহাটে পৌঁছায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা দেরিতে। গতকাল সকাল ৮টায় কমলাপুর থেকে নীলফামারীর উদ্দেশে ছাড়ার কথা ছিল নীলসাগর। কিন্তু ট্রেনটি নীলফামারী থেকে ঢাকার দিকে রওনা দিয়ে সিরাজগঞ্জ পেরোতেই গতকাল রাত ৮টা বেজে যায়। ফলে ঢাকায় রেলওয়ে স্টেশনগুলোতে গতকাল সকালে নীলসাগরের যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে ফিরে যায়।
রেলওয়ে ঢাকা বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মো. সাহাদাত আলী সরকার বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে ট্রেনে সময় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। কুয়াশা ও নাশকতামূলক পরিস্থিতির কারণে এ অবস্থা হয়েছে।’ এর পরও ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের ট্রেন যোগাযোগ স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
গতকাল দুপুরে বিমানবন্দর স্টেশনে গেলে আন্তনগর ট্রেনের টিকিট বিক্রির পাঁচটি কাউন্টারেই ছিল যাত্রীদের ভিড়। আজ শুক্রবার গাইবান্ধা যাওয়ার জন্য কোনো ট্রেনের একটি টিকিটও পাননি সাজেদুল ইসলাম। তিন দিনের চেষ্টায়ও আজ শুক্রবার নীলসাগর ট্রেনে নীলফামারী যাওয়ার টিকিট পাননি মেরাজ হোসেন। তিনি বলেন, ‘বলতাছে, কুনু টিকিট নাই। স্ট্যান্ডিং টিকিটও দিতাছে না।’ বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে গতকাল দুপুরে লোকাল ও মেইল ট্রেনের কাউন্টার এবং অনুসন্ধানে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও পায়নি টিকিটপ্রার্থীরা।
কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে বিভিন্ন ট্রেনের স্ট্যান্ডিং টিকিট যারা পেয়েছে, তারা বেশ খুশি। বড় একটি অংশ টিকিট না পেয়ে ফিরেছে ব্যর্থ মনে। গতকাল সকালে কমলাপুর স্টেশনে চট্টগ্রাম যাওয়ার সুবর্ণ এক্সপ্রেসের যেকোনো শ্রেণীর দুটি টিকিট না পেয়ে ফিরে গেছেন খিলগাঁওয়ের মিন্নত আলী। কমলাপুর স্টেশনে উপস্থিত হয়ে গতকাল রাত সাড়ে ৯টার লালমনিরহাটগামী লালমনি এক্সপ্রেস কখন ছেড়ে যাবে, তা জানতে পারেনি যাত্রীরা। এভাবে দেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে দুই শতাধিক ট্রেন চলাচলে দেরি হচ্ছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, অবরোধে নাশকতা ঠেকাতে চালকদের কম গতিতে ট্রেন চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ট্রেন ছাড়ার আগে শাটল ট্রেন দিয়ে রেলপথ পরীক্ষা করে নেওয়া হচ্ছে। এসব কারণেও ট্রেন চলাচলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
এ ছাড়া অবরোধে নাশকতার আশঙ্কায় নোয়াখালী-লাকসাম রুটের ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে নোয়াখালী ও কুমিল্লা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। গতকাল দুপুর ১টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নির্দেশ বহাল থাকবে। রেলওয়ে সূত্র জানায়, ডিসেম্বরে কয়েক দফা অবরোধে নোয়াখালী-লাকসাম রুটে নোয়াখালী অঞ্চলের সোনাইমুড়ি এলাকায় অবরোধকারীরা রেলসেতুতে আগুন দেয় এবং কুমিল্লা অঞ্চলের বিপুলাসার ও নাথেরপেটুয়া স্টেশনে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। নোয়াখালী রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার মানিক লাল বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করার জন্য ও নাশকতা এড়াতে আপাতত ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
এদিকে গতকাল অবরোধের মধ্যেই রাজধানীর মিরপুর, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, নীলক্ষেতসহ বিভিন্ন স্থানে গণপরিবহন ছিল উল্লেখযোগ্য হারে। স্থানে স্থানে ছিল যানজটও। সকাল থেকে মিরপুর, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, বনানী, কাকলীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে যান চলাচল ছিল স্বাভাবিক।
Facebook Comments