এবার ‘অবৈধ সরকার’ উচ্ছেদ আন্দোলন বিএনপির

0
5
Print Friendly, PDF & Email

ঢাকা, ৫ জানুয়ারি- দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি ৫ জানুয়ারির পর আন্দোলনে ‘অবৈধ সরকার’ উচ্ছেদের দাবি যুক্ত করতে যাচ্ছে। মাঠে সশস্ত্র বাহিনী থাকা এবং নতুন সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি অব্যাহত থাকতে পারে। আপাতত আন্দোলনের নামে নাশকতাই দলটির কাছে মূল ভরসা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন নেতা আলাপকালে বলেছেন, ৫ জানুয়ারির পর তাদের আন্দোলন কত দিন চলবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তাদের আন্দোলনের জোরের ওপর নির্ভর করবে, এটা এক মাসে সমাধান হবে, নাকি পাঁচ বছর লাগবে। স্থায়ী কমিটির সদস্য নন কিন্তু দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন এমন একজন নেতা টেলিফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সময়ের হিসাব করলে আগামী দিনে বিএনপিকে এক অনিশ্চিত আন্দোলনের যাত্রাপথে থাকতে হবে। এই আন্দোলনে ফল দ্রুত হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।’

এদিকে, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বিএনপির আন্দোলন মাঠে সক্রিয় হয়নি, বরং আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী সারা দেশে নাশকতা সৃষ্টি করেছে। অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, বৃক্ষনিধন করেছে নির্বিচারে। সর্বশেষ ভোটের আগের দিন থেকে ভোটকেন্দ্র হিসেবে স্থাপিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া শুরু করে বিএনপি ও তার মিত্ররা। ফলে দাবি আদায়ে মূলত নাশকতাকেই ভরসা করছে দলটি।

মূলত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির আন্দোলন আজ রোববার শেষ হতে যাচ্ছে। কেননা এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য বিএনপি নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায় করতে পারেনি। ফলে তারা অংশও নেয়নি। এরপর ভোট প্রতিহত করার ডাক দেওয়া হয়। সেটাও সফল হয়নি। আজ ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সর্বশেষ বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিবৃতিতে ভোট বর্জনের আহ্বান জানান। তবে আইন অনুযায়ী ভোটার উপস্থিতির ওপর ভোটের ফলাফল নির্ভর না করায় এই নির্বাচন আর প্রতিহত করা সম্ভব নয় বলেই মনে করছে বিএনপি। কেবল ভোটার উপস্থিতি কম হলে তা দেশে-বিদেশে এই ‘একতরফা প্রশ্নবিদ্ধ’ নির্বাচন আরও প্রশ্নবিদ্ধ করবে বলেই তাদের ধারণা।

বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ওসমান ফারুক বলেছেন, সরকার গায়ের জোরে নির্বাচন করছে। এই নির্বাচন ইতিমধ্যেই দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। আজ মানুষ ভোট বর্জন করে সরকারের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান জানাবে। তিনি বলেন, জোর করে ক্ষমতায় থাকা যায় না। এই সরকারকে জনগণ বৈধতা দেবে না।

আন্দোলনের নানা ধাপ: আড়াই বছর আগে ২০১১ সালের জুন মাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে সরকার। এরপর জুলাই মাস থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। আন্দোলনের শুরুতে হরতাল দেওয়া শুরু করে দলটি। তবে সেই হরতালগুলো কার্যকর না হওয়ায় প্রতিটি বিভাগীয় শহর অভিমুখে রোডমার্চ করেন খালেদা জিয়া। এই কর্মসূচি শেষ হয় ২০১২ সালের ১২ মার্চ ‘চল চল ঢাকা চল’ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে। এরপর দাবি আদায়ে দুই দফা সময় বেঁধে দেন খালেদা জিয়া। ওই বছরের শেষ দিক থেকে বিচ্ছিন্নভাবে দাবি আদায়ের জন্য হরতাল দিতে থাকে বিএনপি। তবে ২০১৩ সালের জুন মাসের শেষ থেকে অক্টোবরের ২৫ তারিখ পর্যন্ত হরতালের মতো কঠোর কর্মসূচি থেকে সরে আসে দলটি। তাদের কার্যক্রম সভা-সমাবেশ ও ঢাকার বাইরে বিভাগীয় ও কয়েকটি জেলা শহরে খালেদা জিয়া জনসভা করেন। মূলত ২৫ অক্টোবর ঢাকায় জনসভা থেকে খালেদা জিয়া টানা কর্মসূচির ঘোষণা দেন। ২৬ অক্টোবর থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত দলটি ১০ দিন হরতাল করে। এরপর আবার ২৫ নভেম্বর তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত কর্মসূচি বন্ধ রাখে। ২৬ নভেম্বর থেকে সপ্তাহে এক-দুই দিন বন্ধ রেখে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা অবরোধ করে দলটি। এরপর ২৯ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার ঘোষিত ঢাকামুখী গণতন্ত্রের অভিযাত্রা কর্মসূচি পণ্ড হওয়ার পর ১ জানুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ডাকে দলটি।

দাবিতেও এসেছে পরিবর্তন: আড়াই বছরের এই আন্দোলনে দাবি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে আসে দলটি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন শুরুর নয় মাসের মাথায় তত্ত্বাবধায়কের পরিবর্তে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। এরপর নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা থাকতে পারবেন না বলে বক্তব্য দিয়ে নতুন দাবির সূচনা করেন। ২৫ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার পর তফসিল স্থগিতের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে দলটি। ১৩ ডিসেম্বর যখন নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৪ জন বিজয়ী হন, তখন ২৪ ডিসেম্বর নির্বাচন প্রতিহতের ঘোষণা দেন খালেদা জিয়া। যদিও ৫ অক্টোবর খালেদা জিয়া নির্বাচন প্রতিহতের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান। সর্বশেষ নির্বাচন বর্জনের জন্য ভোটারদের প্রতিও আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে নেতা-কর্মী ও মানুষের প্রতি আহ্বান জানানোর মধ্য দিয়ে এই দশম সংসদ নিয়ে বিএনপির আন্দোলন শেষ হতে যাচ্ছে।

Facebook Comments