বিএনপি নেত্রী দুই কূলই হারিয়েছেন : প্রধানমন্ত্রী

0
5
Print Friendly, PDF & Email

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নির্বাচনে না এসে বিএনপি নেত্রী একুল-ওকুল দুই কুলই হারিয়েছেন। তিনি (খালেদা জিয়া) আর বিরোধীদলীয় নেতা থাকতে পারছেন না। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরদিন গতকাল বিকালে গণভবনের খোলা মাঠে অনুষ্ঠিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। তিনি আন্দোলনরত বিএনপিকে সমঝোতায় আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে আমরা সবার সঙ্গে কথা বলব। আগামী নির্বাচন আলোচনা করেই সমাধান করা যাবে। তবে সেই আলোচনার জন্য বিরোধীদলীয় নেত্রীকে সন্ত্রাস ও সহিংসতা পরিহার এবং যুদ্ধাপরাধী ও জঙ্গিবাদী জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে।

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা মোকাবিলায় তার সরকারের জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে শেখ হাসিনা বলেন, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। যারা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে খেলছে তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, দুর্নীতিবাজ সে যে-ই হোক, এমনকি নিজ দলে যাদের বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তাদেরও কোনো প্রোটেকশন দেওয়া হবে না। সংবাদ সম্মেলনে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তিনি। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ মহাজোটে থাকবেন কিনা এবং তার কী অবস্থা এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এরশাদ সাহেব ভালো আছেন। তিনি চিকিৎসা করাচ্ছেন এবং গলফও খেলছেন। প্রধানমন্ত্রী এ সময় বেশ খোশমেজাজে ছিলেন। স্বভাবসুলভ হাসিঠাট্টায় দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরদানের সময় তাকে আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছিল। বক্তব্যের শুরুতেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জনগণ যে ম্যান্ডেট দিয়েছে সে জন্য দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়ে শেখ হাসিনা এ নির্বাচনকে গণতন্ত্রের বিজয় বলে অভিহিত করেন বলেন, নির্বাচনে জনগণ সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও নাশকতার বিরুদ্ধে শান্তি, সাংবিধানিক ধারা ও গণতন্ত্রের পক্ষে রায় দিয়েছে। পরাজয় হয়েছে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির। নতুন সংসদের মেয়াদ কিংবা আগামী নির্বাচন সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাব কৌশলে এড়িয়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী’ যখনই আসবে তখনই নির্বাচন হবে। এটি নির্ভর করবে বিএনপি নেত্রীর ওপর। তিনি (বেগম জিয়া) তো আগামীতে বিরোধীদলীয় নেত্রীর আসনেও বসছেন না। তিনি একুল-ওকুল দুই কূলই তো হারিয়েছেন। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেত্রী বলেছিলেন, একজন ভোটারও যাতে কেন্দ্রে না যায়। কিন্তু জনগণও তো গেছে। জনগণ যে ভোট দিতে পেরেছে, তা-ই যথেষ্ট, যতটুকু দিয়েছে, আমি তাতেই সন্তুষ্ট। জনগণ বাধা উপেক্ষা করে নির্বাচনে ভোট দিয়েছে। বিরোধী দল বাধা না দিলে আরও বেশি ভোট পড়ত। লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমার সরকারের প্রথম কাজ হবে যে কোনো মূল্যে দেশের জনগণের জানমাল এবং রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষা করা। তাই নির্বাচনোত্তর যে কোনো সন্ত্রাস ও সহিংসতা কঠোর হস্তে দমন করার জন্য প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবাইকে কাজ করার জন্য নির্দেশ দিচ্ছি। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে তিনি বলেন, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে কঠোর হস্তে দমন করা হবে। স্বাধীনতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিচারকাজ অব্যাহত থাকবে এবং রায় কার্যকর করা অব্যাহত থাকবে। শেখ হাসিনা বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারত। আমাদের সবার প্রত্যাশা ছিল বিরোধী দল নির্বাচনে আসবে। এ জন্য আমি তাদের বারবার সংলাপে আসার আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা বেছে নিয়েছে ধ্বংসাত্দক পথ। লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। মানুষ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে, আমরা কাজ করে যাব। উজানে নাও ঠেলে যাওয়াই তো আমাদের কাজ। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আলোচনার উদ্যোগ আমি নিয়েছিলাম। আমি বারবার উদ্যোগ নিয়েছি, নিজে বিরোধীদলীয় নেতাকে টেলিফোন করেছি। কিন্তু ইতিবাচক মনোভাব দেখা যায়নি। তারা লাদেন স্টাইলে দাবি জানিয়ে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করেছেন। তাদের ভয়ভীতি উপেক্ষা করে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। তাই এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না এটা বিশ্বাস করি না।
তারা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হয়ে যাচ্ছেন : প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা স্বাধীনতা বিশ্বাস করে, গণতন্ত্র বিশ্বাস করে তারাই নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তার এ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ প্রতিদিনের বিশেষ প্রতিনিধি শাবান মাহমুদ প্রশ্ন করেন, নির্বাচনে অংশ না নেওয়া সিপিবি স্ব্বাধীনতাবিরোধী কিনা? বেশ কয়েকজন সাবেক কমিউনিস্ট নেতা আওয়ামী লীগে আছেন। সরকারেও বেশ ভালোই ছিলেন। আগামীতেও তারা থাকবেন কি? এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, কমিউনিস্ট পার্টির যেগুলো পাকা পাকা ছিল সেগুলো আমি নিয়ে নিয়েছি। আর যেগুলো পচে গেছে সেগুলোকে বাদ দিয়ে দিয়েছি। এখন যারা ওখানে আছে তারা চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে করতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হয়ে যাচ্ছেন। তারা স্বাধীনতাবিরোধী কিনা এ প্রশ্ন তাদেরকে করলেই ভালো হয়।
প্রয়োজনে দুদক ব্যবস্থা নেবে : মন্ত্রী-এমপিদের অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধি সক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের আয় বেড়েছে। সেই অনুযায়ী মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদ বেড়েছে। তবে কেউ যদি অস্বাভাবিকভাবে সম্পদ বাড়িয়ে থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে। আমি অন্তত কোনো দুর্নীতিবাজকে প্রটেকশন দেব না। কোন পত্রিকায় কি লেখা হচ্ছে, কার বিরুদ্ধে লেখা হচ্ছে, সেটা সেই ব্যক্তিকেই মোকাবিলা করতে হবে।
বিরোধী দলও থাকতে হবে : আগামীতে কোন ধরনের সরকার গঠন করা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জোট নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই সরকার গঠন করা হবে। আমি চাই সব দলের প্রতিনিধিই সরকারে থাকুক। তবে সংসদের বিরোধী দলও থাকতে হবে। কারণ বিএনপি নেত্রী তো এখন একুল-ওকুল দুই কূলই হারালেন।
সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব : আগামীতে আপনার সরকারের পররাষ্ট্রনীতি কী হবে বিদেশি এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সবার সঙ্গেই বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গেই বৈরিতা নয়। সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য সব আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
কবিতা লেখা স্লিপ ফিরিয়ে দিলেন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনের স্থলে পৌঁছার পর এক সময়ের কমিউনিস্ট নেতা ও সাবেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান একটি কাগজে কবিতা লিখে সেটি প্রধানমন্ত্রীর হাতে দিতে আসেন। প্রধানমন্ত্রী তা গ্রহণ না করে ফিরিয়ে দেন। সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য, দলের সিনিয়র নেতা ও নবনির্বাচিত এমপিরা উপস্থিত ছিলেন।

Facebook Comments