সংখ্যালঘুদের দুই শতাধিক বাড়ি ভাঙচুর আগুন লুট তিন স্থানে হামলায় নারীসহ আহত ৪০

0
12
Print Friendly, PDF & Email
ভোট দেওয়ায় যশোরের অভয়নগর এবং দিনাজপুর সদর উপজেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের দুই শতাধিক বাড়ি ও দোকানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালিয়েছে নির্বাচনবিরোধীরা। সীতাকুণ্ডতে হিন্দুদের বাড়িতে ককটেল হামলা, বগুড়ায় খড়ের গাদায় এবং মাগুরা ও সাতক্ষীরায় পানের বরজে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে ইউপি সদস্যসহ চারজনকে পিটিয়ে আহত করা হয়েছে। রবিবার বিকেল থেকে শুরু করে গতকাল সোমবার পর্যন্ত হামলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছে। সাতক্ষীরায় হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সংখ্যালঘু ও অন্যদের দেখতে গিয়ে বোমা হামলার শিকার হয়েছেন সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য মুস্তফা লুৎফুল্লাহ। বিস্তারিত আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের খবরে-
যশোর: নিষেধ সত্ত্বেও নৌকায় ভোট দেওয়ায় রবিবার বিকেলে অভয়নগর উপজেলার চাপাতলা মালোপাড়া গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে। বসুন্দিয়া ইউনিয়ন, চেঙ্গুটিয়া ইউনিয়ন ও বেলেডাঙ্গা শ্যামানন্দপুর গ্রামের ১৮ দলের চার-পাঁচ শ নেতা-কর্মী লাঠি ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে এ হামলা চালায়। তারা এক ঘণ্টা ধরে গ্রামের শতাধিক বাড়ি ভাঙচুর, কয়েকটিতে আগুন ও টাকা-সোনাসহ মূল্যবান সামগ্রী লুট করে। হামলায় অন্তত ২০ জন আহত হয়।
গ্রামের বাসিন্দা নিত্যানন্দ বিশ্বাস বলেন, ‘হামলাকারীদের কারো কারো মুখ বাঁধা ছিল। হাতে ছিল বোমা।’ ওই ঘটনায় শত শত গ্রামবাসী ভৈরব নদের ওপারে দেয়াপাড়া পূজামণ্ডপে রাত কাটায়।
পুলিশ সুপার জয়দেব ভদ্র বলেন, ‘ইতিমধ্যে ওই এলাকায় পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের গ্রামে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।’ হামলাকারীদের ধরতে অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।
দিনাজপুর : দিনাজপুর সদর উপজেলার চেহেলগাজী ইউনিয়নের কর্ণাই গ্রামে রবিবার বিকেলে সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। এ সময় নির্বাচনবিরোধীরা ওই গ্রামের বৈদ্যনাথপাড়া, স্কুলপাড়া, তেলীপাড়া, হাজিপাড়া ও প্রিতমপাড়ার শতাধিক বাড়ি, অর্ধশতাধিক দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করে এবং মূল্যবান মাল লুট করে। তারা কয়েকটি বাড়ি ও দোকানে আগুনও দেয়। আহত হয় নারীসহ ১৫ জন।
হামলার শিকার গ্রামবাসী জানায়, ভোট দেওয়ার অপরাধে তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে নির্বাচনবিরোধীরা। ভোটের আগে এরাই তাদের ভোটকেন্দ্রে না যেতে বলেছিল। তবে হামলা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনকে জানিয়েও তারা কোনো সহযোগিতা পায়নি বলে অভিযোগ করে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো গতকাল সকাল থেকেই অন্যত্র চলে যেতে শুরু করে।
কোতোয়ালি থানার ওসি আলতাফ হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনকাজে ব্যস্ত থাকায় ওদিকে নজর দিতে পারেনি পুলিশ।’ নবনির্বাচিত এমপি ইকবালুর রহিম গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
সাতক্ষীরা : রবিবার কলারোয়ার জয়নগর ইউনিয়নের ক্ষেত্রপাড়া গ্রামের আওয়ামী লীগকর্মী নজরুল ইসলামের বাড়ি ভাঙচুর করে জামায়াত-শিবির। একই সময় তারা বিদ্যা ভৌমিকের ১০ কাঠা পানের বরজে আগুন দেয়। বিদ্যা ভৌমিক বলেন, বিভিন্ন মামলার আসামি জামায়াত নেতারা রাতে তাঁর বাড়িতে আশ্রয় চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি রাজি হননি। এ ছাড়া ভোট দেওয়ার কথা শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা তাঁর পানের বরজ পুড়িয়ে দিয়েছে।
সীতাকুণ্ড : রবিবার রাতে সদর পেশকারপাড়ায় সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাড়িতে ককটেল হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে যৌথ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। সীতাকুণ্ড মডেল থানার ওসি ইফতেখার হাসান বলেন, ‘যেকোনো সহিংসতা রোধে আমরা প্রস্তুত আছি।’
সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জ-১ আসনের ফল ঘোষণার পর জামালগঞ্জের সাচনাবাজার ইউপি সদস্য রবীন্দ্র কুমার দাস (স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ রফিকুল হক সুহেলের সমর্থক) ও আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের সমর্থক রুবেলের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে প্রতিপক্ষের লোকজন বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে রবীন্দ্র কুমার দাস, তাঁর আত্মীয় প্রদ্যুৎ দাস, শ্যামল দাস, সঞ্জিত রায়সহ চারজনকে। এ তথ্য নিশ্চিত করেন জামালগঞ্জ থানার এসআই জহিরুল ইসলাম।
বগুড়া : নন্দীগ্রাম উপজেলার হিন্দু সম্প্রদায়ের ছয়টিসহ মোট সাতটি খড়ের গাদায় আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। দাশগ্রাম হিন্দুপাড়ার নিরঞ্জন চন্দ্রের দুটি, একই গ্রামের শফিকুল আলম বাদশা মিয়ার একটি, ধুন্দার হিন্দুপাড়ার প্রফুল্ল চন্দ্রের তিনটি ও বিশ্বনাথ দাশের একটি খড়ের পালায় আগুন দেওয়া হয়। রবিবার রাত ৮টার দিকে আগুন লাগানোর পর স্থানীয়রা ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা গিয়ে তা নিয়ন্ত্রণে আনেন। নন্দীগ্রাম থানার ওসি শাজাহান আলী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘নির্বাচনসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে এ ঘটনা ঘটতে পারে।’
মাগুরা : সদর উপজেলার বাটাজোড়ে একটি পানের বরজে আগুন দিয়েছে নির্বাচনবিরোধীরা। ক্ষতিগ্রস্ত বরজ মালিক নৃপেণ বিশ্বাস জানান, রবিবারের নির্বাচনে ভোট না দিতে স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের একটি অংশ সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর ওপর হুমকি দিয়ে আসছিল। কিন্তু বাধা অগ্রাহ্য করে তারা ভোট দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওই পক্ষটি রবিবার মধ্যরাতে পানের বরজে পেট্রল ঢেলে আগুন দেয়। এতে ৪০ শতকের ওই পানের বরজ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বরজের পাশে ও ভেতরে লাগানো প্রায় ১০০টি মেহগনি গাছও পুড়ে গেছে। সদর থানার ওসি এ এ হাশেম বলেন, ‘জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দাবি : ভারতের সর্ববৃহৎ সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই) জানিয়েছে, বাংলাদেশের মানবাধিকার গ্রুপগুলো এবং হিন্দু নেতারা সংখ্যালঘুদের রক্ষায় সরকারের প্রতি আরো নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজল দেবনাথ পিটিআইকে বলেন, ‘যশোরের মালোপাড়া গ্রামে প্রায় ৪০০ হিন্দু বাড়িঘর ছেড়ে স্থানীয় ভৈরব নদের আরেক পারে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছি।’ হিন্দুরা সাধারণত আওয়ামী লীগকেই সমর্থন করেন- এ ধরনের একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হতে চাই না, কারো রাজনৈতিক হাতিয়ারও হতে চাই না।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাকে (হিন্দুত্বকে) আলোচনার (রাজনৈতিক) বাইরে রাখুন। আমি নির্যাতিত হতে চাই না।’
Facebook Comments