তারেকের হাতে বিএনপির হাল! আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা

0
6
Print Friendly, PDF & Email
ধারাবাহিক হরতাল-অবরোধ দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার চিন্তা করছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। তাদের দাবির পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে এবং নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা রাখতে ব্যতিক্রমধর্মী কিছু কর্মসূচিও এ সময়ে পালন করবে দলটি। আর দলের কর্মসূচি নির্ধারণসহ সার্বিক বিষয়ে এখন থেকে দিকনির্দেশনা দেবেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলের একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এরই মধ্যে তারেক রহমান নির্বাচন-পরবর্তী ‘অবৈধ সরকারের’ সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা নাকচ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পূর্ব লন্ডনের ডকল্যান্ডে একটি হোটেলে স্থানীয় সময় রবিবার রাত ৯টায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ ঘোষণা দেন। গতকাল সোমবার সকালে লন্ডন থেকে ই-মেইলে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়েছে। তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য লন্ডনে রয়েছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক আন্দোলনে দলের বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতার ভূমিকায় তাঁদের ওপর অসন্তুষ্ট তারেক রহমান। ওই নেতাদের ওপর আস্থা রেখেও কাক্সিক্ষত ফল না পাওয়ায় তিনি নিজেই এখন থেকে আন্দোলনসহ সার্বিক বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এত দিন এসব বিষয়ে তারেক তাঁর মা ও দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে পরামর্শ করতেন।
তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতার সাম্প্রতিক ভূমিকায় প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ তারেক। যেসব নেতা সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে দলের ক্ষতি করছেন এবং আন্দোলন বেগবান করতে দিচ্ছেন না, তাঁদের সম্পর্কে তিনি খোঁজখবর নিয়েছেন। এ জন্য নিয়মিত তাঁকে তথ্য দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি দেশে থাকা কয়েকজন নেতাকে।
দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতার ওপর তারেকের আস্থা হারানোর প্রমাণ রয়েছে সম্প্রতি ফাঁস হওয়া এক টেলিফোন কথোপকথনেও। কথোপকথনটি ছিল তারেক রহমান ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীর। এতে তারেক রহমান স্পষ্টতই দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামসহ সিনিয়র নেতাদের ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ মন্তব্য করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা কালের কণ্ঠকে জানান, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল আন্দোলনে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন তারেক রহমান। ফলে তিনি বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। আপাতত দেশে ফিরতে না পারলেও লন্ডনে বসেই তিনি দল গোছানোর কাজ সারবেন এবং আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দেবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতাও দলের কয়েকজন নেতাকে দোষারোপ করেছেন। রাজধানীতে আন্দোলন না হওয়ায় দলের ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। ওই নেতা জানান, দলের হাল এখন তারেক রহমানের হাতেই থাকছে।
একটি সূত্রে জানা যায়, তারেক রহমান গতকাল দলের সিনিয়র এক নেতাকে টেলিফোনে বলেছেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন দেশবাসী বর্জন করেছে। তাই এখন আর ঘরে বসে থাকার উপায় নেই। নেতাদের আত্মগোপনে থাকলে দল চলবে না। তৃণমূল নেতাদের নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দলের জন্য কাজ করতে হবে। দলের দুর্দিনে দলের হাল ধরতে হবে। মাঝিহীন নৌকার মতো দল চললে হবে না।
দলের একাধিক নেতা জানান, এই মুহূর্তে সারা দেশের তৃণমূল নেতা-কর্মীরাও দলের নেতৃত্বে তারেক রহমানকে সরাসরি দেখতে চান। সিনিয়র নেতাদের ওপর আস্থাহীনতা এবং তৃণমূল নেতাদের মনোভাব টের পেয়েই তারেক রহমান প্রবাসে থেকেও দলের হাল ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
কয়েক মাসে ফল পাওয়ার আশা : বিএনপি মনে করছে, ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে গেলে আগামী কয়েক মাসে একটি ফল পাওয়া যাবে। এ নির্বাচন কোনোভাবেই জনগণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য হবে না। ফলে সরকার প্রতিনিয়ত চাপের মধ্যে থাকবে। এতে সরকার আগামী এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে আরেকটি নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে।
দলীয় সূত্রমতে, সরকার সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের যে মনোভাব, তার সঙ্গে বিএনপির মনোভাব ও প্রত্যাশার মিল রয়েছে। শিগগিরই বাংলাদেশে আরেকটি নির্বাচনের লক্ষ্যে জোর চেষ্টা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় একটি নির্বাচন হয়ে গেলেও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দরকার বলে মনে করে তারা।
বিএনপি নেতারা মনে করছেন, সামনের দিনগুলো সরকারের জন্য কঠিন হবে। দেশ চালাতে গিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে তারা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জিএসপি বাতিল করতে পারে। এ ধরনের প্রতিকূল অবস্থায় সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে। তবে সরকার শপথ নেওয়ার আগে সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রত্যাশা করছে বিএনপি। দলের নেতা-কর্মীরা মনে করেন, ২৪ জানুয়ারির আগেও অনেক কিছু ঘটতে পারে।
বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক কূটনীতিক জানান, যুক্তরাষ্ট্র আগামী এপ্রিল বা জুনে আরেকটি নির্বাচনের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে। এ বিষয়ে বিএনপির সঙ্গে তাদের আলোচনাও হয়েছে। বিএনপি মনে করছে আলোচনা হলে হবে, কিন্তু আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
একটি সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া ‘মুক্ত’ হয়ে শিগগিরই কয়েকটি বিভাগীয় সমাবেশ করবেন, যাতে নেতা-কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা হয়। পাশাপাশি সরকারবিরোধী আন্দোলনে যেসব নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন, তাঁদের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতেও ওই সব পরিবারের কাছে যাবেন তিনি। ঢাকায় একটি মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিএনপি আজকের অবস্থানে এসেছে। তাই যেকোনো প্রতিকূল অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সক্ষমতা বিএনপির রয়েছে। আমরা জনগণের যৌক্তিক দাবি নিয়ে আন্দোলন করছি। সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে।’
আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা : লন্ডনে সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চূড়ান্ত আন্দোলন’ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, আত্মত্যাগকে অর্থবহ করে তুলতে প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে যেকোনো মূল্যে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ‘দেশবাসীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণে এগিয়ে চলা এ আন্দোলনে যার যার অবস্থান থেকে সবাই সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। দেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি ও প্রতিটি বাড়িকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করুন।’ তিনি বলেন, ‘একাত্তরে আমরা এভাবেই দেশকে হানাদারমুক্ত করেছিলাম। সেই সংগ্রাম ছিল স্বাধীনতা অর্জনের। আর আজকের এ সংগ্রাম সার্বভৌমত্ব রক্ষার। সেই সংগ্রাম ছিল দেশকে হানাদারমুক্ত করার। আর আজকের এ সংগ্রাম দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার।’
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি শায়েস্তা চৌধুরী কুদ্দুস, সাধারণ সম্পাদক কয়সর আহমেদ, বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মহিদুর রহমান, যুবদলের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক এনামুল হক লিটন প্রমুখ।
১৮ দলীয় জোটের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রহসনের নির্বাচন প্রতিহত ও বর্জন করায় দেশবাসীর প্রতি কৃজ্ঞতা প্রকাশ করে তারেক রহমান বলেন, ‘তামাশার নির্বাচনকে কার্যত রুখে দেওয়ার মাধ্যমে দেশবাসী একটি লক্ষ্য অর্জন করল মাত্র। এটি চূড়ান্ত সাফল্য নয়। বরং চলমান স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রক্রিয়ারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।’

তারেক রহমান বলেন, ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য পরিবার-পরিজন-সহযোদ্ধা হারানোর গভীর কষ্ট বুকে চেপেই আমাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও তাদের পরিবারগুলোর সেই আত্মত্যাগ সংগ্রামরত বাংলাদেশিরা ইনশাআল্লাহ কোনোদিনই ভুলবে না। আত্মত্যাগের এই স্মৃতিই হবে আমাদের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চূড়ান্ত আন্দোলনের সংগ্রামী প্রেরণা।’ তিনি বলেন, ‘প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা, যাঁরা ৫ জানুয়ারির কলঙ্কিত নির্বাচন প্রতিক্রিয়ায়  জড়িত ছিলেন, নিজ চোখে সরকারের কারচুপি ও অরাজকতা দেখেছেন, তাঁদের আমি অনুরোধ করব, বিবেকের কাছে সততা নিয়ে প্রশ্ন করুন- আপনারা কাদের পক্ষ হয়ে, কাদের বিপক্ষে কাজ করছেন?’

Facebook Comments