একদলীয় শাসনের ঝুঁকিতে বাংলাদেশঃ নিউইয়র্ক টাইমস

0
6
Print Friendly, PDF & Email

বাংলাদেশে দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিদ্বেষ সত্ত্বেও দুই দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে মূলত তাঁদের মধ্যেই। কিন্তু গত সপ্তাহের ঘটনায় তাঁদের সেই সহাবস্থানের সমাপ্তি ঘটতে পারে। শুরু হতে পারে একদলীয় শাসনের ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ।
গতকাল রোববার যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস-এর একটি প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনটির শিরোনাম: ‘ক্ষমতার জন্য দুই নেত্রীর লড়াইয়ে ভারসাম্য হারানোর ঝুঁকিতে বাংলাদেশ’। পত্রিকাটির হিসাবে, সর্বশেষ চারটি নির্বাচনে দুবার করে প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। তাঁদের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্ষমতার কেন্দ্রে একধরনের ভারসাম্য বজায় রেখেছিল।
প্রতিবেদনটি শুরু হয়েছে গত সপ্তাহে দুই নেত্রীর কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে। প্রতিবেদক এলেন বারিজান লিখেছেন, গত সপ্তাহে রাজধানী ঢাকায় নিজ নিজ সুরম্য বাসভবন থেকে দুই নেত্রী সাগ্রহে নজর রেখেছিলেন অপরজন কী করেন, সেদিকে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাঁর ড্রয়িংরুমে দাওয়াত করেছিলেন অতিথিদের। এ সময় তাঁর কঠিন মুখে ছিল মধ্যযুগীয় রানিদের মতো কর্তৃত্বের ছাপ। সপ্তাহটি তাঁর কেটেছে কার্যত গৃহবন্দী অবস্থায়। বাড়ির বাইরে ছিল পুলিশ ও বালুবোঝাই পাঁচটি ট্রাকের অবরোধ। কিন্তু এর পরও তাঁকে বেশ অবিচল দেখাচ্ছিল। খালেদা জিয়া সোজাসাপ্টা বলেন, ‘অনেকবারই আমি গৃহবন্দী থেকেছি। জেলেও থেকেছি অনেকবার।’
সেখান থেকে কয়েক মাইল দূরে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা—হাস্যোজ্জ্বল এবং কিছুটা নানি-দাদি ধরনের—বাড়ির লনে লালগালিচা বিছানো এক অনুষ্ঠানে একটি স্থূল একপেশে নির্বাচনে বিজয় ঘোষণা করেন। পশ্চিমা সরকার ও দেশি পত্রপত্রিকা থেকে জোর সমালোচনা করা হচ্ছে। কিন্তু আস্থার বর্ণচ্ছটা চকচক করছিল তাঁর মুখে, হাসি-তামাশা করছিলেন স্বচ্ছন্দে।
এই নির্বাচনের ফলে দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরও জটিল হবে বলে মনে করেন কি—এক সাংবাদিকের এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় চশমার নিচ দিয়ে তাঁর দিকে তাঁকান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘আপনি কী চান, আমার কাঁদতে শুরু করা উচিত? ওহ, সংকট, আমরা সংকটে পড়েছি! আপনি কী সেটা চান?’
গত ২০ বছরে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ মূলত ছিল এই দুই নারীর হাতে। দুজনই একগুঁয়ে এবং কর্তৃত্ববাদী, কিন্তু তুমুল জনপ্রিয়। গত চারটি নির্বাচনে দুবার করে বিজয়ী হয়েছেন তাঁরা। তাঁদের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতায় একধরনের ভারসাম্য সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু গত সপ্তাহের ঘটনার ফলে সেই ভারসাম্যের অবসান এবং ঝুঁকিপূর্ণ একদলীয় শাসনের উদ্যোগ শুরু হতে পারে।
নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজয়ীই সব ক্ষমতার অধিকারী হবে—এটাই হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এ জন্য বিজয়ী হতে নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য সব ধরনের বাজি ধরেন দুই নেত্রী। এবার নির্বাচন বয়কট এবং রাজপথে সহিংস বিক্ষোভের মাধ্যমে লক্ষ্য পূরণের বাজি ধরেছিলেন খালেদা জিয়া। আর শেখ হাসিনা বাজি ধরেছিলেন প্রধান বিরোধী দলকে বাইরে রেখে নির্বাচন করার। ধরে নিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিন্দা এতটা কঠোর হবে না, যাতে তাঁকে পিছু হটে নতুন করে নির্বাচন দিতে হয়। এখন মনে হচ্ছে, বাজিতে জিতে শেখ হাসিনা সব পাওনা কুড়িয়ে নিয়েছেন। অদূর ভবিষ্যতে নতুন নির্বাচনের বিষয়ে কেউ আর তেমন জোর দিয়ে কিছু বলছে না। কিন্তু এর পরও যে দেশটিতে তুমুল গণবিক্ষোভের ঐতিহ্য আছে, সেখানে নতুন সরকার স্থিতিশীল হতে পারবে বলে মনে করার মতো বিশ্লেষক খুবই কম আছেন। বিশেষ করে খালেদা জিয়া যদি হরতাল-অবরোধ অব্যাহত রাখেন। দুই নারীর কেউই পিছু হটতে রাজি নন এবং বাইরের বিশৃঙ্খলার আঁচ তাঁদের সুরম্য বাসভবনে পৌঁছাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।
প্রতিবেদনে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘খালেদা জিয়াকে রাজনীতির বাইরে রাখা না-রাখা নিয়ে সরকারের মধ্যে বিতর্ক আছে। তারা বলছে, এটা হবে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আমি বলেছি, তিনি থাকলেই বরং বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি আছে।’
এ অবস্থার প্রেক্ষাপটেই নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন দুই নেত্রী। বাংলাদেশে নির্বাচন-প্রক্রিয়ার বৈশিষ্ট্যে বেশ জটিলতা আছে। বিগত সময়ে ভোট জালিয়াতি রোধে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থা করে এর সমাধান করা হয়েছিল। শেখ হাসিনা সেই ব্যবস্থা বাতিল করেছেন। নীতির প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানের জন্য গর্বকারী খালেদা জিয়া আবারও একই অবস্থান নিলেন।
বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিল খালেদা জিয়ার দল বিএনপি। এর পরও যখন এটা স্পষ্ট হয়ে উঠল যে প্রতিপক্ষ নির্বাচন আয়োজনে বদ্ধপরিকর, তখন হরতাল-অবরোধের ডাক দিয়ে সড়ক-মহাসড়ক অচল করে দিলেন খালেদা জিয়া। বিক্ষোভকারীরা আগুন দিল ট্রাক-বাসে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে যাত্রীসহ। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। ভোটারদের ভোটদানে নিরুৎসাহিত করতে নির্দেশ দেন খালেদা জিয়া।
নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল সত্যিই কম। পরের দিন পত্রিকায় সরকারি দলের কর্মী-সমর্থকদের ভোট জালিয়াতির খবর ছাপা হয়েছে, যার ফলে ভোটের হার প্রায় ৪০ শতাংশ ওঠে। পশ্চিমা সরকারগুলো এর জোর সমালোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা নতুন নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছে। খালেদা জিয়া এতে খুশি হয়েছেন। নির্বাচনের পর সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় তিনি একটি পত্রিকায় ছাপা হওয়া ভোটারবিহীন কেন্দ্রের ছবি দেখিয়ে বলেন, ‘সেখানে কোনো মানুষ যায়নি, ছিল কিছু কুত্তা।’
সরকারের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, ‘তারা নিশ্চয়ই হতাশ হয়েছে, ভোটার উপস্থিতি তারা যেমন আশা করেছিল, তেমন হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ চায়, সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন। আমাদের জনগণ ভোট দিতে পছন্দ করে। এই বাস্তবতা সরকার অস্বীকার করতে পারে না বা অন্ধের মতো না দেখার ভান করতে পারে না।’
তবে শহরের আরেক মাথায় বসে শেখ হাসিনা জালিয়াতির কারণে বিজয় কালিমালিপ্ত হয়েছে কি না, এ প্রশ্ন হেসেই উড়িয়ে দিয়েছেন।
বিএনপিকে ছাড়া নতুন সাংসদদের শপথ নেওয়ার মাধ্যমে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে কার্যত একদলীয় শাসনের সূচনা করবেন। আর খালেদা জিয়া সরকারি সুযোগ-সুবিধা হারাবেন, যা তিনি দুই দশক ধরে পেয়ে আসছেন।
বিরোধীদের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে এবং সরকারও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে হাজার হাজার মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী গওহর রিজভী জানিয়েছেন, নতুন নির্বাচন যে হবে, তা নিয়ে তাঁর কোনো সংশয় নেই। কিন্তু সেটা কবে নাগাদ, তা তিনি জানেন না। এর মধ্যে শূন্যতা পূরণে বিএনপির দলত্যাগী অংশকে নিয়ে বিরোধী একটি নতুন জোট দাঁড়িয়ে যাবে বলে তিনি আশা করছেন। এই পরিস্থিতি খালেদা জিয়ার জন্য তাঁর ছেলের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া অসম্ভব করে তুলতে পারে।
গওহর রিজভী বলেন, ‘দুটি বিষয় নিশ্চিত। নির্বাচন হবে এবং বিএনপি অংশ নেবে। খালেদা জিয়া থাকবেন অথবা থাকবেন না।’

Facebook Comments