গণজাগরণ মঞ্চের প্রয়োজন ফুরিয়েছে তাই হামলা!

0
16
Print Friendly, PDF & Email
pic-12 69642

গাজীপুর নিউজ ডেস্কঃ একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধী মিরপুরের কসাইখ্যাত কাদের মোল্লার ফাঁসির বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়ার প্রতিবাদে শুরু হয় এক ‘অমানিশা দূরীকরণ’ আন্দোলন। ঢাকার শাহবাগে গড়ে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ। আরেক একাত্তরের চেতনায় গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি জ্বলে ওঠা সেই আলোর শিখা ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। সব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে একযোগে গর্জে ওঠে লক্ষ-কোটি কণ্ঠ। সম্মিলিত জনতা রাজপথে নেমে তাদের মনের কথা জানিয়ে দিয়েছিল সরকারকে। সারা দেশের মানুষের মনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা, অবিশ্বাস থেকে সূত্রপাত হওয়া এ আন্দোলনের ফলে টনক নড়ে ক্ষমতাসীনদের। আইন সংশোধনের মাধ্যমে আপিলের সুযোগ সৃষ্টি হয় কাদের মোল্লার রায়ের বিরুদ্ধে। এরই ধারাবাহিকতায় পরে কাদের মোল্লার ফাঁসি হয় এবং তা কার্যকরও হয়। আর বুক ফুলিয়ে তা ফলাও করে বেড়ায় ক্ষমতাসীনরা। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, যে গণজাগরণ মঞ্চের কারণে অর্জিত হয় এত বড় সাফল্য, আজ তাদেরই ওপর চড়াও হচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। সম্প্রতি গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক ও কর্মীদের ওপর দফায় দফায় হামলা করেছে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ। এমনকি আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা নিজের মুখে বলছেন, আর নাকি প্রয়োজন নেই গণজাগরণ মঞ্চের।
প্রয়োজন ফুরিয়েছে তাই হামলা!
অথচ গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা গত বছর ৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে বক্তব্য  দেওয়ার সময় বলেছিলেন, ‘আমার মনও শাহবাগের আন্দোলনে ছুটে যেতে চায়।’ এদিন তিনি আন্দোলনকারীদের অভিনন্দনও জানিয়েছিলেন। শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, আওয়ামী লীগের দাপুটে মন্ত্রী, প্রবীণ ও প্রভাবশালী নেতা থেকে শুরু করে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, এমনকি পাড়ার সরকার সমর্থক হোমরাচোমরা নেতা-কর্মীরাও শাহবাগে ছুটে গিয়েছিল আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হতে। তখন মঞ্চে দেখা গেছে ছাত্রলীগের নেতাদের; তাঁদের সঙ্গে আওয়ামীপন্থী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিজীবীদের।
প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগকে রক্ষাকারী গণজাগরণ মঞ্চের নেতা-কর্মীদের কি ব্যবহার করা শেষ? নাকি মঞ্চের নেতারা আওয়ামী লীগের থাবা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করার কারণেই এখন তাঁদের ওপর এই হামলা-নিপীড়ন? শাহবাগের আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন কালের কণ্ঠে গত বছরের ১৭ মার্চ গণজাগরণ মঞ্চকে আওয়ামীকরণের নেতিবাচক দিক তুলে ধরে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
পুলিশের এখন মারমুখী আচরণের কারণ জানতে চাইলে রমনা জোনের পুলিশের সহকারী কমিশনার শিবলী নোমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ৪ এপ্রিল একই সঙ্গে দুই পক্ষ সমাবেশ আহ্বান করায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি হতে পারে আশঙ্কায় তাদের কাউকেই সেখানে সমাবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের ওপর হামলার জন্য দায়ী করা হয়েছে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীদের। এ বিষয়ে গতকাল শনিবার মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, ‘৩ এপ্রিল যাঁদের ওপর হামলা হয়েছে সেই আহতরা দুজনকে চিনতে পেরেছেন। তাঁরা হলেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা নাসিম রুপক ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা শেখ আসমান।’ হামলার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাঁরা অব্যাহতভাবে মঞ্চবিরোধী প্রচার প্রপাগন্ডা ছড়াচ্ছিলেন। তারই অংশ হিসেবে এ হামলা করে থাকতে পারে।’
অভিযোগ সম্পর্কে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও যুবলীগের উপদপ্তর সম্পাদক নাসিম আল মমিন রূপক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ হামলায় ছাত্রলীগ বা যুবলীগের কেউ জড়িত নয়। ছাত্রলীগ বা যুবলীগের কেউ জড়িত এমন প্রমাণ যদি কেউ দিতে পারে, আমরা জাতির কাছে ক্ষমা চাইব। অন্যথায় যারা এ অভিযোগ করেছে তাদের জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।’
এদিকে যুদ্ধাপরাধের দাবিতে আন্দোলনরত প্রগতিশীল শক্তি ও ব্যক্তিরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। দ্রুত সরকারের হস্তক্ষেপও কামনা করেছেন তাঁরা।
এ হামলার নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই হামলা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর হামলা। কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে এ হামলা করা হয়েছে, তা রহস্যাবৃত। সরকার দ্রুত এ বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করবে, এটা আমার আহ্বান।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। গণজাগরণ কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিষয় নয়। এটা জাতীয় ঘটনা। এক বছর আগে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে এ মঞ্চ প্রতিষ্ঠা করেছিল। সে থেকেই তারা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল। আমার বোধগম্য নয়, সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন, পুলিশ কেন তাদের ওপর হামলা করল- এর কারণ খুঁজে বের করতে হবে। যদি গণজাগরণ মঞ্চ ও সরকারের মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকে, যত দ্রুত সম্ভব তা মিটিয়ে ফেলতে হবে। এ ছাড়া স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিরা এ ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ফায়দা লুটতে পারে।’
আওয়ামী লীগের কাছে মঞ্চের প্রয়োজন শেষ : গণজাগরণ মঞ্চ সারা দেশে আওয়ামী লীগের ভেঙে পড়া সাংগঠনিক অবস্থাকে নৈতিক শক্তি দিয়েছিল। এতে জামায়াতসহ যুদ্ধাপরাধী রাজনৈতিক দল ও তাদের মিত্র শক্তিরা বেকায়দায় পড়েছিল। কিন্তু যখন আওয়ামী লীগ একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছে, তখন গণজাগরণ মঞ্চের ওপর হামলে পড়েছে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি গণজাগরণ মঞ্চের প্রয়োজন শেষ? আওয়ামী লীগের নেতারাও মনে করছেন মঞ্চের প্রয়োজন এখন আর নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে আওয়ামী লীগ বা সরকারের কোনো বৈরী সম্পর্ক নেই। তাই মুজিব-আদর্শের সৈনিকদের তাদের ওপর হামলা করার কোনো কারণ নেই। তিনি বলেন, গণজাগরণ মঞ্চের দাবি বাস্তবায়ন হয়েছে; এখন তো তাদের মাঠে থাকার কথা নয়।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন বলেন, ‘যে পরিপ্রেক্ষিতে গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে উঠেছিল, এর ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা ইতিমধ্যে নিঃশেষিত হয়েছে। ফলে এটির এখনই ইতি টানা উচিত। গত কয়েক দিনে গণজাগরণ মঞ্চের নেতা-কর্মীরা যেসব কর্মকাণ্ড করেছে, এতে করে মঞ্চের অর্জনগুলো নষ্ট হচ্ছে। পক্ষান্তরে যুদ্ধাপরাধী ও তাদের দোসরদের জন্য সুযোগ তৈরি হচ্ছে।’
গণজাগরণ মঞ্চের বিষয়ে কথা বলতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ। তিনি বলেন, ‘আমি গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে শুরুতেও ছিলাম না, মাঝে বা শেষেও ছিলাম না। আওয়ামী লীগের যে নেতারা মঞ্চের সঙ্গে ছিলেন, তাঁরাই এ বিষয়ে কথা বলবেন।’
মঞ্চ দখলের চেষ্টা : সম্প্রতি গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ড. ইমরান এইচ সরকার ও মঞ্চের সংগঠক-কর্মীরা সরকার সমর্থক সংগঠন থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলছিলেন। বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি যুবলীগ ও ছাত্রলীগ। গত বছরের ২৬ মার্চ থেকে গণজাগরণ মঞ্চের সব কর্মসূচি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয় ছাত্রলীগ। এর পর থেকে ছাত্রলীগ দুটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটায়। এগুলো হলো ‘গৌরব ৭১’ ও ‘মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড’। এসব সংগঠনের সংগঠকরাই ‘গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠকবৃন্দ’ নাম দিয়ে মঞ্চের মুখপাত্র ড. ইমরান এইচ সরকারের নেতৃত্বের বিরোধিতা করছেন।
সূত্র জানায়, এসব সংগঠন দিয়ে মঞ্চবিরোধী প্রচার অব্যাহত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ‘মুক্তিযোদ্ধা সংসদ  সন্তান কমান্ড’-এর সভাপতি মেহিদী হাসান গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর নেতা মীর ফাহিম সাব্বির উদয়কে পিটিয়ে আহত করেন। একই সময় মঞ্চের আরেক সংগঠক শামিম আরা নীপার ওপরও হামলা চালানো হয় মেহিদী হাসানের নেতৃত্বে। সর্বশেষ শাহবাগে গত ৩ এপ্রিল প্রথম দফায় যে হামলা হয়েছে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের ওপর, সেখানেও নেতৃত্ব দিয়েছেন মেহেদী হাসান।
এ প্রসঙ্গে মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, ছাত্রলীগ আন্দোলন থেকে পিছটান দেওয়ার পর তারা তিনটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ করে। আর এসব সংগঠনের জন্ম হয় গত বছরের ২৬ মার্চের পর। ফলে তারা গণজাগরণ মঞ্চের কেউ না।
জানা যায়,  শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের মিডিয়াসেল নামে একটি অস্থায়ী ঘর ছিল। তা দখলে নেয় ‘গৌরব ৭১’ নামের সরকার সমর্থক সংগঠনটি। ইমরান এইচ সরকার ও মঞ্চ লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা বা জাতীয় সংগীত গাওয়ার অনুষ্ঠানে বিশেষ একটি ব্যাংকের অর্থ নেওয়ার বিরোধিতা করেন। ২৬ মার্চ গণজাগরণ মঞ্চ আলাদাভাবে স্বাধীনতা দিবস পালন করে। পরের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে গণজাগরণ মঞ্চবিরোধী একটি মানববন্ধন করে ছাত্রলীগ। তাদের বক্তব্য ছিল, জাতীয় পতাকা অবমাননা করেছেন গণজাগরণ মঞ্চের নেতারা। সেখানে ডা. ইমরান এইচ সরকার ও মঞ্চের নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা করে বক্তব্য দেন ছাত্রলীগ নেতারা।
৩ এপ্রিলের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন মঞ্চের সংগঠক আজম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, গণজাগরণ মঞ্চের মিডিয়া সেল নামে অস্থায়ী একটি ঘর ছিল শাহবাগে। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজপত্র থাকত। কিছু চেয়ার-টেবিলও ছিল। বিকেলে এসে তিনি দেখেন, কাগজপত্র ও চেয়ার সেখানে নেই। এ কারণে মঞ্চের কর্মী আদনান গৌরব ’৭১-এর শিশির ও আবিরকে বলেন, ‘চেয়ার নিয়েছেন সমস্যা নেই। আপনারা কাগজপত্রগুলো ফেরত দিন। ওগুলো জামায়াত-শিবিরের হাতে পড়লে আমাদের অনেকেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ব। এ সময় শিশির ও আবির আদনানকে গালমন্দ করে। তারা বলে, শাহবাগ তাদের। এখানে অন্য কেউ জায়গা পাবে না। দ্রুতই ঘটনা পাল্টে যায়। এ সময় আবির পাশের চায়ের দোকান থেকে কেটলি নিয়ে এসে আদনানের গায়ে গরম পানি ঢেলে দেয়। পাশের চায়ের দোকান থেকে কেরোসিন নিয়ে এসে আদনানের গায়ে ঢেলে দিয়ে আগুনও ধরিয়ে দেয়। এতে তার শরীরের কিছু অংশ পুড়ে যায়। বুক ও হাতের বেশ কিছু অংশ ঝলসে যায়।’
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে আরো জানা যায়, মঞ্চের কর্মীদের ওপর এ হামলার খবর ডা. ইমরান এইচ সরকারকে জানানো হলে তিনি শাহবাগ থানায় গিয়ে মামলা করার পরামর্শ দেন। মঞ্চের কর্মী রেশমী আহমেদ, এস এ অরণ্য, সনাতন, নবেন্দু সাহা জয়, আদনানসহ ছয়-সাত জনের একটি দল যায় শাহবাগ থানায় মামলা করতে। এ সময় সেখানে প্রবেশ করে যুবলীগ নেতা নাসিম রুপকের নেতৃত্বে আরেকটি দল। শাহবাগের থানার ওসি সিরাজুল ইসলামের সামনে আরেক দফা হামলা করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের এ দলটি। এ সময় তারা মঞ্চের কর্মী এস এ অরণ্যের মাথা ফাটিয়ে দেয়। অনেককেই তারা পেটায়। থানায় আসার আগে তারা চায়ের দোকান থেকে গরম পানির কেটলি সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। সেই গরম পানি মঞ্চের কর্মী ও উদীচী নেতা সনাতনের গায়ে ঢেলে দেয়। সনাতনের হাত ঝলসে গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পুলিশের সামনে এ হামলার পরও সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ কোনো ভূমিকা নেয়নি। থানার সিসি ক্যামেরাতে এ ভিডিও ফুটেজ থাকার কথাও বলেছে প্রত্যক্ষদর্শীরা।
জানতে চাইলে শাহবাগ থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম  বলেন, ‘হামলার পর দুই পক্ষ থেকেই মামলা করতে থানায় এসেছিল। এ সময় আরেক দফায় হামলার ঘটনা ঘটে। দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
সিসি ক্যামেরায় হামলার বিস্তারিত রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি আমাদের সামনে ঘটেছে। এ কারণে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দরকার নেই।’
তবে এসব ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন সরকার সমর্থিত মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ মিজবাহ। তিনি দাবি করেন, গোলাম আযমের মামলার রায়ের পর ইমরান এইচ সরকারের অবস্থান, মুখপাত্র হয়ে একনায়কতান্ত্রিক আচরণ ও আর্থিক অস্বচ্ছতার কারণে গণজাগরণ মঞ্চে বিভক্তি আসে। ইমরানের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
অবশ্য বেশ কিছুদিন ধরেই এই অংশটি ইমরান এইচ সরকারের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, আর্থিক অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ফেসবুক-ব্লগে প্রচার চালাচ্ছে। ইমরানপন্থীদের পাশাপাশি তাঁর বিরোধী এ অংশের কর্মীরাও নিয়মিত শাহবাগের ‘প্রজন্ম চত্বরে’ জমায়েত হতো, আড্ডা দিত।
ছাত্রলীগের পিছটান : একসময় ছিল গণজাগরণ মঞ্চের সামনের সারিতে দাঁড়ানোর জন্য ছাত্রলীগের নেতারা মরিয়ে হয়ে যেতেন। টিভি ক্যামেরা বা পত্রিকার ক্যামেরার সামনে মুখ দেখানো, বক্তব্য দেওয়া- সব ক্ষেত্রে তাঁরা ছিলেন সামনে। আন্দোলন শুরু করেছিলেন যাঁরা সেই ব্লগার নেতাদের তেমন একটা দেখাই যেত না বা পাত্তা দেওয়া হতো না। মঞ্চের মধ্যে শুরুতেই এ নিয়ে অস্বস্তি ছিল। এ পরিস্থিতিতে গত বছরের ২৬ মার্চ এক জনসমাবেশ করা হয়। ওই সমাবেশে ছাত্রলীগের সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগকে অনেক অনুরোধের পর তিনি আসেন। কিন্তু এরপর আর কোনো কর্মসূচিতে ছাত্রলীগকে দেখা যায়নি।
মঞ্চ ও সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, গত বছরের ৪ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দেয় মঞ্চ। এ কর্মসূচির ঘোর বিরোধিতা করেছিল ছাত্রলীগ। কিন্তু মঞ্চের অন্যান্য সংগঠন ও সংগঠক এ কর্মসূচি পালনে কঠোর অবস্থানে থাকার কারণে ছাত্রলীগ মঞ্চের আর কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেয়নি।
অসময়ে দলবাজরা নেই : ঢাকা ও এর আশপাশে গণজাগরণ মঞ্চ গত বছর পুরো ফেব্রুয়ারি ও মার্চে বেশ কয়েকটি কর্মসূচি  হাতে নেয়। এসব কর্মসূচির প্রতিটিতে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি ও তাঁদের লোকজনের শোডাউন ছিল দৃষ্টিকটু। এসব কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সরকার সমর্থিত সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা ছিল মঞ্চের সামনে।
জানা যায়, ২০১৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মিরপুরের সমাবেশে এসে সংহতি জানান আওয়ামী লীগের স্থানীয় তিন সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদার, আসলামুল হক ও রিয়াজউদ্দিন মল্লিক। যাত্রাবাড়ীর সমাবেশের দিনও দেখা গেছে একই পরিস্থিতি। স্থানীয় সংসদ সদস্য মোল্লা হাবিবুর রহমান ৪ মার্চ যাত্রাবাড়ী গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশে বক্তব্য দেন। ১৫ মার্চ আশুলিয়ার সমাবেশে লোক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য তালুকদার মো. তৌহিদ জং মুরাদ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
মারমুখী পুলিশ : ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ আন্দোলন শুরু করে। এরপর রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে টানা ১৬ দিন আন্দোলন চালিয়ে যান এ মঞ্চের সংগঠকরা। পুলিশ তখন সিসি ক্যামেরা দিয়ে সমাবেশের নিরাপত্তা রক্ষা করেছিল। ঢাকা সিটি করপোরেশন দিয়েছিল অস্থায়ী টয়লেটও। সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়নি যে গণজাগরণ মঞ্চ সমাবেশের অনুমতি নেয়নি। কিন্তু গত ৪ এপ্রিল সেই গণজাগরণ মঞ্চ শাহবাগে সমাবেশ করতে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। পুলিশের যুক্তি, গণজাগরণ মঞ্চ সমাবেশের অনুমতি নেয়নি। এ কারণে বেধড়ক পিটুনিতে ড. ইমরান এইচ সরকার, ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লাকী আক্তার ও মঞ্চের কর্মী মাহমুদুল হক মুন্সীসহ ছয়জন আহত হয়। এর আগে পাকিস্তান দূতাবাস ঘেরাওকালেও ড. ইমরান এইচ সরকারসহ অনেককেই লাঠিপেটা করেছিল পুলিশ।
আগে অনুমতির প্রয়োজন হয়নি, এখন কেন অনুমতি চাচ্ছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে রমনা জোনের পুলিশের সহকারী কমিশনার শিবলী নোমান কালের কণ্ঠকে বলেন, এর আগে দুই পক্ষ হয়নি। এ কারণে তখন অনুমতির বিষয়টিতে নজর দেওয়া হয়নি। সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের কোনো নির্দেশনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো নির্দেশনা নেই, যা করা হয়েছে তা স্বাভাবিক নিয়মেই করা হয়েছে।
সূত্রঃ কালের কণ্ঠ।

Facebook Comments