অখণ্ড বাংলা ফেরত চাই

0
62
Print Friendly, PDF & Email
undevided bangla

গাজীপুর২৪ নিউজঃ বঙ্গবিভাগ-১৯৪৭ বা বাংলাবিভাগ-১৯৪৭ বা বঙ্গভঙ্গ-১৯৪৭ বাংলার রাজনৈতিক ভূগোলে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন। ১৯৪৭ সালের বঙ্গভঙ্গ ভারত বিভক্তির ফলশ্রুতিতে সম্পন্ন হয়। বাংলা বিভক্ত হওয়ার ধারণাটি অবশ্য কার্জন থেকে শুরু হয়নি। ১৭৬৫ সালের পর থেকেই বিহার ও উড়িষ্যা বাংলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে সরকারী প্রশাসনিক এলাকা হিসেবে বাংলা অতিরিক্ত বড় হয়ে যায় এবং বৃটিশ সরকারের পক্ষে এটির সুষ্ঠু শাসনক্রিয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। বঙ্গভঙ্গের সূত্রপাত ওখান থেকেই। এর ফলে বঙ্গ প্রদেশ দুই অংশে বিভক্ত হয়ে পরে যার পূর্বাঞ্চল পাকিস্তানে এবং পশ্চিমাঞ্চল ভারতের সাথে যুক্ত হয়। পূর্ববঙ্গের নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান রাখা হয় এবং যা পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ গঠন করা হয়।

 

বঙ্গ প্রদেশের আয়তন ছিল ১,৮৯,০০০ বর্গ মাইল এবং জনসংখ্যা ছিল ৭৮.৫ মিলিয়ন। বঙ্গের পূর্বাঞ্চল ভৌগোলিক এবং অপ্রতুল যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে পশ্চিমাঞ্চল হতে প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল। ১৮৩৬ সালে উত্তরাঞ্চলের প্রদেশগুলোকে বঙ্গ থেকে পৃথক করে একজন লেফটেন্যান্ট গভর্ণরের অধিনে ন্যস্ত করা হয় এবং ১৮৫৪ সালে বঙ্গের প্রশাসনিক দায়িত্ব হতে গভর্নর-জেনারেল-ইন-কাউন্সিলকে অব্যাহতি দিয়ে একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের উপর অর্পণ করা হয়। ১৮৭৪ সালে সিলেটসহ আসামকে বঙ্গ হতে বিচ্ছিন্ন করে চিফ-কমিশনারশীপ গঠন করা হয় এবং ১৮৯৮ সালে লুসাই পাহাড়কে এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

 

১৯০৩ সালে প্রথম বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবসমূহ বিবেচনা করা হয়। তখন বঙ্গ হতে চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করা এবং ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলাদ্বয়কে আসাম প্রদেশে অন্তর্ভুক্ত করার একটি প্রস্তাবও ছিল। তেমনিভাবে ছোট নাগপুরকে মধ্যপ্রদেশের সঙ্গে আত্তিকরণেরও একটি প্রস্তাব ছিল। ১৯০৪ সালের জানুয়ারিতে সরকারীভাবে এই পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয় এবং ফেব্রুয়ারিতে লর্ড কার্জন বঙ্গের পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে এক সরকারী সফরের মাধ্যমে এই বিভক্তির ব্যাপারে জনমত যাচাইয়ের চেষ্টা করেন। তিনি বিভিন্ন জেলার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে এই বিভক্তির বিষয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বক্তৃতা দেন।

 

পার্বত্য ত্রিপুরা রাজ্য, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও রাজশাহী (দার্জিলিং বাদে) বিভাগ এবং মালদা জেলা, আসাম প্রদেশের সঙ্গে একীভূত হয়ে এই নতুন প্রদেশ গঠন করবে। এর ফলে বঙ্গ শুধু তার বৃহৎ পূর্বাঞ্চলই হারাবে না, তাকে হিন্দীভাষী পাঁচটি রাজ্যও মধ্যপ্রদেশকে ছেড়ে দিতে হবে। অন্যদিকে পশ্চিমে সম্বলপুর এবং মধ্যপ্রদেশের পাঁচটি ওড়িয়া-ভাষী রাজ্যের সামান্য অংশ বঙ্গকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। ফলে বঙ্গের আয়তন দাঁড়ায় ১,৪১,৫৮০ বর্গ মাইল এবং জনসংখ্যা ৫৪ মিলিয়ন যার মধ্যে ৪২ মিলিয়ন হিন্দু ও ৯ মিলিয়ন মুসলিম।

 

নতুন প্রদেশটির নামকরণ করা হয় “পূর্ব বঙ্গ ও আসাম” যার রাজধানী হবে ঢাকা এবং অনুষঙ্গী সদর দফতর হবে চট্টগ্রাম। এর আয়তন হবে ১,০৬,৫৪০ বর্গ মাইল এবং জনসংখ্যা হবে ৩১ মিলিয়ন যাদের মধ্যে ১৮ মিলিয়ন মুসলিম ও ১২ মিলিয়ন হিন্দু। এর প্রশাসন একটি আইন পরিষদ ও দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি রাজস্ব বোর্ড নিয়ে গঠিত হবে এবং কলকাতা হাইকোর্টের এখতিয়ার বজায় থাকবে। সরকার নির্দেশ দেয় যে পূর্ব বঙ্গ ও আসামের পশ্চিম সীমানা স্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট থাকবে সাথেসাথে এর ভৌগোলিক, জাতিক, ভাষিক ও সামাজিক বৈশিষ্টাবলিও নির্দিষ্ট থাকবে। সরকার তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে ১৯শে জুলাই, ১৯০৫ সালে এবং বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয় একই বছরের ১৬ই অক্টোবর।

 

এই ঘটনা এক প্রচণ্ড রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। পূর্ব বঙ্গের মুসলিমদের এই ধারণা হয় যে নতুন প্রদেশের ফলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের সুযোগ বেড়ে যাবে। যদিও পশ্চিম বঙ্গের জনগণ এই বিভক্তি মেনে নিতে পারল না এবং প্রচুর পরিমাণে জাতীয়তাবাদী লেখা এই সময় প্রকাশিত হয়। ১৯০৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্গভঙ্গ রদ করার প্রস্তাবকদের জন্য এক মর্মস্পর্শী গান আমার সোনার বাংলা লেখেন, যা অনেক পরে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতে পরিণত হয়।

 

এই সকল রাজনৈতিক প্রতিবাদের ফলশ্রুতিতে ১৯১১ সালে বঙ্গ আবার একত্রিত হয়। ভাষাতাত্ত্বিক এক নতুন বিভক্তির মাধ্যমে হিন্দি, ওড়িয়া এবং অসমি অঞ্চলগুলো বঙ্গ হতে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনা হয়। এরই সাথে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে নয়া দিল্লীতে স্থানান্তর করা হয়।

 

পশ্চিমবঙ্গ পূর্ব ভারতের একটি রাজ্য। পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা প্রায় নয় কোটি দশ লক্ষ। জনসংখ্যার ভিত্তিতে এটি ভারতের চতুর্থ বৃহত্তম রাজ্য এবং বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম অঙ্গরাজ্য। পশ্চিমবঙ্গের আয়তন ৩৪,২৬৭ মাইল (৮৮,৭৫০ কিমি)। এই রাজ্যের সীমানায় নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র এবং ভারতের ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, বিহার, সিকিম ও আসাম রাজ্য অবস্থিত। এই রাজ্যের রাজধানী কলকাতা। উত্তরের হিমালয় পর্বতশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি অঞ্চলকে বাদ দিলে এ রাজ্যের অধিকাংশ এলাকাই গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের অন্তর্গত।

 

অধুনা যে ভূখণ্ডটি পশ্চিমবঙ্গ নামে পরিচিত, সেটি প্রাচীনকালে বঙ্গ, রাঢ়, পুণ্ড্র ও সুহ্ম জনপদের অন্তর্গত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে অশোক এই অঞ্চল জয় করেন। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে পশ্চিমবঙ্গ গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পশ্চিমবঙ্গে সুলতানি শাসনের গোড়াপত্তন হয়। এরপর অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে। ব্রিটিশ শাসনে কলকাতা একটি প্রধান শহর হিসেবে বিকাশ লাভ করেছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক অবধি কলকাতাই ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। আবার এই সময়েই পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে কলকাতাকে কেন্দ্র করে বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি ও হিন্দুধর্মে একটি সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়; এটি বাংলার নবজাগরণ নামে পরিচিত। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ্বে পশ্চিমবঙ্গ ছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ বাংলা প্রদেশ ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত হলে হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গ একটি অঙ্গরাজ্যের আকারে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ্বে পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী মতবাদ ও আন্দোলন প্রসার লাভ করে। 

 

উক্ত ইতিহাসের আলোকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় কলকাতা, উত্তর দিনাজপুর, আসাম, ত্রিপুরা, ওড়িশা-র প্রকৃত মালিক ছিল বাংলাদেশ। ভারতের বিগত সরকার এ রাজ্যগুলো তাঁদের দখলে নিয়ে নেয়, তাই প্রকৃত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারতের উচিত বাংলাদেশের অংশ বাংলাদেশকে ফিরিয়ে দিয়ে আগ্রাসী বক্তব্য ও মনোভাব পরিহার করা। 

 

মুলতঃ ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপির অন্যতম নেতা সুব্রাক্ষণিয়ম স্বামী বিতর্কিত বক্তব্য প্রদান করেছেন বিশ্ব রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নিজেকে আলোচিত করার উদ্দেশ্যে, এর বেশি কিছু নয়। এটা হলো ভারতীও রাজনৈতিক নেতাদের তথাকথিত “গায়ে মানে না আপনি মোড়ল” ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা, শত হলেও তো অনেক সময় পর ক্ষমতা পেয়েছেন তাই মস্তিস্ক বিকৃতির পরিস্ফুটন ঘটেছে। এ ধরনের বক্তব্য প্রদাণ করার জন্য উনাকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সর্বোপরি বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিৎ। 

 

বাংলাদেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়, কোন দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাঙ্গালিরা সাধারনতঃ পছন্দ করে না কিন্তু দেশমাতৃকার প্রশ্নে যেমন ১৯৭১ সালেundevided bangla-1 গর্জে উঠেছিল আগ্রাসী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে, তেমনি প্রয়োজনে বাঙ্গালিরা আবারো গর্জে উঠবে ভারতীও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। বাঙালি রক্ত দিতে জানে, মৃত্যুকে তারা পরোয়া করে না, দেশমাতৃকা রক্ষায় বাঙ্গালী সময়মত সময়োচিত জবাব দিবে। আমরা আমাদের কলকাতা, উত্তর দিনাজপুর, আসাম, ত্রিপুরা, ওড়িশা ফেরত চাই আমরা অখণ্ড বাংলা দেখতে চাই।

Facebook Comments