কৌশলে এগুচ্ছে সরকার

0
4
Print Friendly, PDF & Email
1401333423

সরকারবিরোধী কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য কূটনীতিক সম্পর্কোন্নয়ন এ দুই কৌশল সামনে নিয়ে এগুচ্ছে শাসক জোট। অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি শান্ত রাখতে রাজধানীতে সরকারবিরোধী কর্মসূচির ব্যাপারে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সরকার। এ জন্য গুম-অপহরণ নিয়ে সুশীল সমাজ ও বিএনপির কর্মসূচি কৌশলে আটকে দেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব সৃষ্টিকারী ভারত, চীন ও জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগী সরকার। পরাশক্তি রাশিয়ার সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে চায় সরকার। দূরে রাখতে চায় না যুক্তরাষ্ট্রকেও।

শাসক দল আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, আগামী দিনগুলোতে ক্ষমতার মসনদে ভালোভাবে থাকতে সরকার এ কৌশল অবলম্বন করেছে। এর অংশ হিসেবেই খালেদা জিয়ার উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ ঠেকাতে সর্বশেষ গত শনিবার আইনজীবীদের কর্মসূচিও পণ্ড করে দেয় সরকার। এর দুই দিন আগে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে নাগরিক সমাজের সঙ্গে গুম-খুন নিয়ে আলোচনা সভা করতে দেয়া হয়নি খালেদা জিয়াকে। এর আগে সাত খুনের পর নারায়ণগঞ্জ ও সিদ্ধিরগঞ্জে দুই দফা চেষ্টা করেও খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে সমাবেশের অনুমতি মেলেনি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও সমাবেশের অনুমতি পায়নি বিএনপি। সংসদ ভবনের সামনে সুশীলদের মানববন্ধনও সরকার ভণ্ডুল করে দেয়।

সরকারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সারাদেশে গুম, খুন ও অপহরণের ঘটনায় সরকার বেশ চাপে পড়েছে। এ অবস্থায় ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর ম্রিয়মাণ হয়ে পড়া বিরোধী দল গুম-খুনের ঘটনাকে ইস্যু করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে এমন আশঙ্কা আছে সরকারের। এ পরিস্থিতি ঠেকাতেই সরকার বিএনপির চেয়ারপার্সনের কর্মসূচির ওপর অনানুষ্ঠানিক বিধি নিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচি খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের মামলার মতো ব্যক্তিগত বিষয়ের ওপর আটকে রাখতে চায় সরকার। এটা সম্ভব হলে দলটি নিজেরা সংগঠিত হতে পারবে না। আর ব্যাপক জনমতও পক্ষে টানতে ব্যর্থ হবে। জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা দুটির বিচার বিশেষ জজ আদালতে চলছে। দুটি মামলাতেই অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এ নিয়েও চাপে পড়েছে বিএনপি।
এর পাশাপাশি সরকার দেশে নতুন করে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে এবং বিভিন্ন দেশের সমন্বিত অংশীদারিত্ব জোরদার করতেও আগ্রহী। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক সহযোগিতাকারী দেশ জাপান সফর করছেন। বাংলাদেশকে চলতি বছর ৬০০ কোটি ডলার (বাংলাদেশি অর্থে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা) সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এ সহায়তা দেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়- দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো গভীর করার লক্ষ্যে সার্বিক অংশীদারি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ঐকমত্যে পৌঁছাবে।

আগামী ৬ জুন ৩ দিনের সফরে চীন যাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, আনুষ্ঠানিকভাবে জাপানের পর প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছেন। মূলত অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি প্রশস্ত করতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সফলভাবে জাপান সফর করে আসছেন এবং চীনে যাচ্ছেন। গত ৩০ মার্চ চীনের ইউনান প্রদেশের গভর্নর লি ঝিয়েং ঢাকা সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেন। তখন তিনি প্রধানমন্ত্রীকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানান। প্রধানমন্ত্রী চীনের বেইজিং যাওয়ার পাশাপাশি ইউনান প্রদেশও সফর করবেন। সেখানে বাংলাদেশ ও ইউনান প্রদেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা প্রাধান্য পাবে। কারণ চীনের প্রদেশগুলোর মধ্যে ইউনানের অবস্থানই বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছাকাছি। তাছাড়া সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে ইতিমধ্যে কয়েকটি চীনা কোম্পানি আগ্রহ প্রকাশ করেছে। পদ্মা সেতু নির্মাণের মূল কাজও পেয়েছে চীনের একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। তবে বাংলাদেশ এখনো বাণিজ্য ঘাটতিতে রয়েছে। এ ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে বাংলাদেশে চীনের প্রায় ২শ’ কোম্পানি ব্যবসা করছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে চীনা বিনিয়োগের বিষয়টিকেও প্রাধান্য দেয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরকে সামনে রেখে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশকে একশ’ মিলিয়ন ইউয়ানের (চীনের মুদ্রা) একটি বড় অংকের সহযোগিতা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে চীন। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর উন্নয়নের জন্য এ সহায়তা দেবে দেশটি। এই বড় অঙ্কের অর্থের মাধ্যমে চীনের কাছ থেকেই স্বল্প দূরত্বে ছোড়ার মতো সারফেস-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কিনবে বাংলাদেশ। এটি বাংলাদেশের বিমানবাহিনীকে আরো শক্তিশালী করবে।

এছাড়া দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এর আগে ২১ সদস্য বিশিষ্ট প্রতিরক্ষা বিষয়ক একটি প্রতিনিধি দলকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল চীন। চীনের কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান জেনারেল জু কুইলিয়াঙের নেতৃত্বে ওই প্রতিনিধি দলটি গত ১১ থেকে ১৩ মে দু’দিনের ঢাকা সফরে চারটি দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। পাশাপাশি, বাংলাদেশের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য চীনের ন্যাশনাল পিপলস্? কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির ভাইস চেয়ারপার্সন ইয়ান জুনকিকে তিন দিনের এক সফরে ঢাকায় পাঠিয়েছিল চীন।

জানা যায়, ভূ-রাজনীতির অংশ হিসেবেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন মাত্রা দিতে চায় চীন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন নিয়ে সম্পর্কে ভাটা পড়ায় সরকার আঞ্চলিক শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন চাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোসহ পশ্চিমা বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়ায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার আশায় সরকার সম্পর্কোন্নয়নের জন্য এখন নয়াদিল্লি, টোকিও, বেইজিং ও মস্কোর মুখাপেক্ষী হয়েছে। বিএনপিবিহীন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে হাসিনার সরকারের সমর্থনে কণ্ঠ জোরালো করেছিল এই চার দেশ। কিন্তু সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানিয়েছিল পশ্চিমা বিশ্ব।

আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম অক্ষুন্ন রাখা এবং বাংলাদেশের সমর্থনে বিদেশি ক্ষমতার পাশে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর করছেন।

এছাড়াও আগামী ১৬-১৮ জুন কম্বোডিয়ান প্রধানমন্ত্রী হুন সেন ছাড়াও বেশ কয়েক ভিভিআইপি ঢাকা সফরে আসবেন। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের ঢাকা আসা নিশ্চিত এবং দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারাও বিভিন্ন দেশে যাতায়াতের মাধ্যমে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কাজ করতে পারেন সে লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কাজ করে যাচ্ছেন।

এ পর্যায়ে এসে দিল্লির সরকার পরিবর্তনে ঢাকার বর্তমান সরকার সাময়িক চাপে পড়েছে। কিন্তু তা কাটিয়ে উঠতে জাপান ও চীনের সহযোগিতাও প্রয়োজন। এ জন্য জাপানের পর চীন সফর করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশ সফরের জন্য আরো এক দফা আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে। তবে ইতিমধ্যেই শেখ হাসিনাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি।

অন্যদিকে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদকে ভারত সফরের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও এই আমন্ত্রণ সাদরে গ্রহণ করেছেন। কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা শেষে তার ভারত সফরের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম মানবকণ্ঠকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার আরো কঠোর হবে। আর আমাদের কূটনীতি চলছে বঙ্গবন্ধুর দর্শনের ওপর- ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়।’

Facebook Comments