হাসিনাকে রিমান্ডে নিলেই খুলবে জিয়া হত্যার রহস্য

0
4
Print Friendly, PDF & Email
tarek 937307669

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জিয়াউর রহমান হত্যার বিষয়ে জানতেন অভিযোগ তুলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, তাকে রিমান্ডে নেওয়া হলেই জিয়া হত্যার রহস্য বের হবে। 

 

তিনি বলেন, হাসিনা দেশে ফেরার ১৭ দিন পরই কেন জিয়া খুন হলেন? হাসিনা কিছু যদি না জানবেন, তাহলে বোরকা পরে পালাচ্ছিলেন কেন? 

 

বুধবার সন্ধ্যায় মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের পুত্রা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। র‌্যাবের বিরুদ্ধে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি উদ্বোধন করতে মালয়েশিয়া বিএনপি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি।

 

‘ভালো আছি, আবার ভালোও নেই’

‘ভালো আছি, আবার ভালোও নেই’ বলে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা শুরু করেন তারেক রহমান। 

 

দলের নেতাকর্মীদের তিনি বলেন, আপনারা এখানে ভালো আছেন। কারণ, এখানে হাসিনা নেই। গুম নেই। দেশে অধিকাংশ মানুষই ভালো নেই। ২৪ ঘণ্টাই বাজেভাবে দিন অতিবাহিত করছে।

 

তারেক বলেন, সম্প্রতি শেখ হাসিনা এক বক্তব্যে বলেছেন, শহীদ জিয়া মারা না গেলে বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য জিয়ার বিচার হত। ৮১ সালের ৩০ মে জিয়া শহীদ হন। জিয়া হত্যার পর শেখ হাসিনা কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে বোরখা পরে পালাচ্ছিলেন। হাসিনা দেশে আসার ১৭ দিনের মধ্যেই জিয়া শহীদ হয়েছেন। আমরাওতো বলতে পারি, তুমি কেন পালাচ্ছিলে? 

 

এসময় হাসিনাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

 

আওয়ামী লীগ নিজেদের জন্যও বিপজ্জনক

তারেক বলেন, আপনাদের আমি একটু সতর্কবার্তা দেই। আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র, সমাজ, জনগণের জন্য বিপজ্জনক। আপনার জন্য, আপনার পরিবারের জন্য বিপজ্জনক। তারা নিজেরাও নিজেদের জন্য বিপজ্জনক। দেশে একটি প্রবাদ রয়েছে। কাক কাকের মাংস খায় না। আওয়ামী লীগ সেটি ভুল প্রমাণ করেছে।

 

তিনি আরো বলেন, নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে কাদের লাশ ভেসেছিল? তাদের নেতা নাকি আপামনিকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফোন দিয়ে গুমের খবর দিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে একজন ভাইমনিও রয়েছেন। আপামনি ভাইমনিকে কিছুই বলেননি। আওয়ামী লীগ স্বার্থের জন্য সবকিছুই করতে পারে।

  

প্রধানমন্ত্রীকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে তারেক বলেন, বিডিআর ঘটনায় ৫৭ জন অফিসার মারা গেল। ডিফেন্স মিনিস্ট্রির দায়িত্ব ছিলেন শেখ হাসিনার। এজন্য শেখ হাসিনার বিচার হবে।

 

অস্ত্র উদ্ধার ঘটনায় হাসিনার বিচার হবে

অস্ত্র উদ্ধার ঘটনা নিয়ে তারেক বলেন, অবৈধ সরকারের চাপে কোর্ট রায় দিয়েছে। সেসময় বিএনপি সরকার দেশের একটি স্থান থেকে অস্ত্র উদ্ধার করেছিল। আওয়ামী লীগ তাদেরই ফাঁসির রায় দিয়েছে যারা সেই অস্ত্র উদ্ধার করেছিল। এখন কিছুদিন ধরে বাংলাদেশে অস্ত্র উদ্ধার চলছে। এজন্য হাসিনার বিচার হবে।

 

‘ভয়ে মানুষ দেশ ছাড়ছে’

তারেক বলেন, গত তিন চারদিন ধরে কুয়ালালামপুরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছি। জিজ্ঞাসা করেছি এখানে কেন এসেছেন? একটি কমন জবাব পেয়েছি।

 

তারা বলেছেন, আওয়ামী লীগ আমার জায়গা দখল করে উল্টো আমার বিরুদ্ধে কেস দিয়েছে। কেউ বলছেন, আমার পুকুর দখল করে আমার নামে কেস দিয়েছে। ভয়ে তারা এদেশে পালিয়ে এসেছেন।

 

‘বাপের রেকর্ড ভাঙবে বেটি’

তারেক বিভিন্ন ঘটনার সূত্র তুলে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার কন্যা শেখ হাসিনার সময়ের এবং কাজের মিল খুঁজে দেখান।

 

তিনি বলেন, এবার দেখেন বাপ-বেটির মিলটা কোথায়! শেখ হাসিনার বাপের সময় কী হয়েছিল? বাপ-বেটির মিলটা একটু পিছনে ফিরে দেখি। ৭৩ সালের ১৭ আগস্ট ইত্তেফাক পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, ‘নিরাপত্তার আকুতি ঘরে ঘরে। মানুষের মধ্যে হতাশা বৃদ্ধি পেয়েছে, বাড়ি ছেড়ে অন্য স্থানে জায়গা নিচ্ছে। যাদের সঙ্গতি নেই, বনে জঙ্গলে দিন কাটাচ্ছে।’ বর্তমানেও একই অবস্থা।

 

৭৩ সালের ওই নিউজের সঙ্গে বর্তমান সময়ের পার্থক্য নেই। বাপের রেকর্ড ভাঙবে বেটি।

 

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সবচে খারাপ সময় ছিল শেখ মুজিবের সময়। এরপরে এখন।

 

‘নির্বাচন কমিশন মাথামোটা করাপটেড’

৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পাঁচ শতাংশ ভোটও কাস্ট হয়নি। মাথামোটা অপদার্থ করাপটেড নির্বাচন কমিশন বলেছে, ৪৩টি কেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি। ওইসব কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড কমিটি নিশ্চয়ই ছিল। তারাই তো তাদের নির্বাচন বর্জন করেছেন।

 

তারেক বলেন, অথচ অবৈধ সরকারের অবৈধ হাসিনার নিয়োগ পাওয়া অবৈধ ডিআইজি বলেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে।

 

তিনি বলেন, শুনেছি, হাসিনাকে তার দলের অনেকে অনেক নামে ডাকেন। আসেন আমরাও তাকে নতুন একটি নাম দেই। তারা নিজেদের দাবি করে মুক্তিযুদ্ধের সোল ডিস্ট্রিবিউটর।

 

আওয়ামী লীগ- জাতীয় পার্টি মাসতুতো ভাই

তিনি বলেন, কিছুদিন আগের বক্তব্যে বলেছিলাম, তাদের ইতিহাসটা। আওয়ামী লীগতো নিজেদের নামই পরিবর্তন করেনি। কারণ আওয়ামী শব্দটাই উর্দু, মানে জাতি। আর লীগ ইংরেজি শব্দ। জাতি আর লীগ মিলে হয়ে গেল জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগ- জাতীয় পার্টি মাসতুতো ভাই।

 

আওয়ামী লীগ চোরের খনি

তিনি বলেন, ১৯৮২ সালে এরশাদ এলে হাসিনা বলেছিল, আই অ্যাম নট আনহ্যাপি। কিছুদিন আগে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে কিছু বিদেশিকে ডেকে স্বর্ণ দেয়। কিন্তু সেখানেও স্বর্ণের পরিমাণ ছিল কম।

 

এসময় তিনি বঙ্গবন্ধুর কথা উল্লেখ করে বলেন, শেখ মুজিব বলেছিলেন, সবাই পায় সোনার খনি, আমি পেলাম চোরের খনি। শেখ মুজিব মরে গেছেন, কিন্তু তার কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে।

 

তারেক বলেন, শেখ হাসিনা নাকি বলেছেন, সবাই সোনা চুরি করে। তার মানে তিনিও চুরি করেন। তিনি এমন কথা বলতেই পারেন। কারণ খনিটাতো চোরের।

 

তিনি বলেন, ৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ২০০১ সালের ২৭ জুন টিআইবি প্রথমবারের মতো বললো, বাংলাদেশ দুর্নীতিতে প্রথম। ‍মুজিববের সময় হেনরি কিসিঞ্জারও বলেছিলেন বাংলাদেশ তলাবিহীন ঝুঁড়ি। এরপর ২০১২ সালে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক আবারো পদ্মাসেতু থেকে অর্থ বরাদ্দ সরিয়ে নেয়।

 

‘যমুনা ব্রিজ করেছি, দুর্নীতি হয়নি’ 

তিনি বলেন, আমরাওতো যমুনা ব্রিজ করেছি। সে সময় কেউ বলতে পারবে না একটা টাকাও এদিক সেদিক হয়েছে। চুরি করেছে সোনা চোর হাসিনা। বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টর ধ্বংস করেছে। বিচার বিভাগকে ধ্বংস করেছে।

 

বিচার বিভাগে সরকারি হস্তক্ষেপ 

বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি দৈনিকের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত সংবাদের উদ্ধৃতি করে তারেক রহমান বলেন,  হাসিনা ও তার মন্ত্রী আদালতকে শাসিয়েছেন তাদের কথা মতো চলতে হবে। বিচারপতি কাজী এমদাদুল হক বলেছেন, সরকারি হস্তক্ষেপে বিচার বিভাগ কাজ করতে পারছে না। তাহলে বিচার বিভাগ রাখার দরকার কি?

 

আওয়ামী লীগ বিচার বিভাগকে ধ্বংস করেছে মন্তব্য করে তারেক বলেন, ৭৫ সালের ১৫ জানুয়ারি বাকশাল গঠনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত হয়। শেখ মুজিব নিজে আওয়ামী লীগকে গলাটিপে হত্যা করেছিল। আওয়ামী লীগের উচিত জিয়ার সমর্থকদের সালাম করা।

 

তিনি বলেন, ৭৯ সালের ৬ এপ্রিল পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতি আবার শুরু হয়। আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতাকর্মীর উচিত শহীদ জিয়ার নেতাকর্মীদের সালাম করা। কারণ তাদের রাজনীতিতে ফিরিয়ে এনেছেন শহীদ জিয়া।

 

আওয়ামী লীগই র‌্যাব ধ্বংস করেছে

র‌্যাব প্রসঙ্গে তারেক বলেন, আওয়ামী লীগ র‌্যাবকে ধ্বংস করেছে। র‌্যাব এখন আওয়ামী লীগের ভাড়াটে রক্ষী বাহিনীর কাজ করছে। আজ সেই র‌্যাব শুধু বিএনপি নয়, আওয়ামী লীগের নেতাদেরও হত্যা করছে। শুনেছি, মুন্সিগঞ্জে গ্রামবাসী ১৪ জন র‌্যাবকে ধরেছে। পরে হয়তো পিটুনি দিয়েছে বা পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছে। আওয়ামী লীগ র‌্যাবকে ধ্বংস করেছে।

 

তিনি বলেন, আমরা ২০০১ সালে যখন সরকার গঠন করলাম। আইনশৃঙ্ক্ষলা রক্ষা করতে র‌্যাব গঠন করেছিল বিএনপি সরকার।

 

২০০৫-০৬ সালের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, বিএনপি কার্যালয় থেকে নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে ক্যান্টনমেন্টের বাসায় যাচ্ছিলাম। ফার্মগেটের সিগন্যালের পাশে সিএনজি থামে। চালক জিজ্ঞাসা করেন, আপনি তারেক জিয়া না?

 

তারেকের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে চালক বলেন, আপনারা র‌্যাব বানিয়ে আমাদের বাঁচিয়েছেন। শহরের বিভিন্ন অলিতে গলিতে ঢুকলে আমাদের সারাদিনের উপার্জন বিসর্জন হত। আমাদের এখন আর ছিনতাইয়ের কবলে পড়তে হয় না। পরে সবুজ বাতি জ্বলে উঠলে দোয়া করতে বলে চলে যাই।

 

বক্তব্য শেষে একটি কাগজে স্বাক্ষর করার মধ্য দিয়ে র‌্যাব বিলুপ্তির দাবিতে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি উদ্বোধন করেন তিনি।

 

এসময় তারেক বলেন, কথা দিয়েছেন, কথা রাখতে হবে। আপনারা র‌্যাব’র বিলুপ্তি চান? তাহলে এই কাগজে স্বাক্ষর করতে হবে।

 

ইউনিভার্টি মালায়ার ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন ড. আব্দুল হান্নানের সভাপতিত্বে সভায় আরো বক্তব্য রাখেন, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন।

 

তিনি বলেন, তারেক আমার পুত্রসম। আমার দাবি, তিনি যেন অবশ্যই তার পিতা হত্যার বিচার করেন।

 

সভায় মালয়েশিয়া বিএনপির একাংশের সভাপতি মো. শহীদুল্লাহ বিএনপিকে শক্তিশালী করতে মালয়েশিয়ায় প্রবাসীরা সর্বোচ্চ সহযোগীতা করবে বলে আশ্বাস দেন।

 

অনুষ্ঠনে আরো বক্তব্য রাখেন, নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল সালাম আজাদ ও শফিকুল ইসলাম, মালয়েশিয়া বিএনপি’র নেতা মাহবুবুল আলম শাহ, তালহা মাহমুদ, ইউনিভার্সিটি মালায়া’র শিক্ষক অধ্যাপক ড. আলতাফ হোসেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের রাকিবুর রহমান, শ্রমিক দলের জোবায়েদ হোসেন, জাতীয়তাবাদী স্টুডেন্ট ফোরামের মহিউদ্দিনসহ আরো অনেকে।

 

এসময় নেতারা মালয়েশিয়া বিএনপির বিভক্তি দূর করে কমিটিতে যোগ্য নেতাকর্মীদের স্থান দিতে তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানান। 

 

তারেকের আগে বক্তৃতা করেন মালয়েশিয়া বিএনপি নেতারা। 

Facebook Comments