সুন্দরবনে তেল অপসারণে সাহায্যের প্রস্তাব করেছে লন্ডনের বিশেষজ্ঞ দল

0
17
Print Friendly, PDF & Email
Sundarban 0

সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে ‘ওটি সাউদার্ন স্টার সেভেন’ নামে একটি তেলবাহী ট্যাংকার ডুবির ঘটনায় ছড়িয়ে পড়া তেল অপসারণে লন্ডন ভিত্তিক একটি বিশেষজ্ঞ দল সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছে। নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান বিবিসি বাংলাকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, রোববারের মধ্যে এই দল ঢাকায় এসে পৌঁছাবে। এরপর সরকারের সঙ্গে তাদের বৈঠক হবে। সেখানে সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়া তেলের আস্তরণ কিভাবে সরানো যায়, তারা সে বিষয়ে পরামর্শ এবং প্রস্তাব দেবে।

তবে এই দলটির ব্যাপারে বিস্তারিত কোন তথ্য মন্ত্রী জানাতে পারেন নি।

এদিকে নদীর পানি থেকে তেল অপসারণের জন্য রাসায়নিক পদার্থ ছিটানোর কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলেছে, ডুবে যাওয়া ট্যাংকারের তেল ছড়িয়ে পড়ায় চারদিনে ক্ষতি যা হওয়ার হয়েছে, সেখানে রাসায়নিক দ্রব্য ছিটানো হলে আরও ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে কিনা, সেটা ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অপরদিকে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবির ঘটনায় ছড়িয়ে পড়া তেলের কারণে ঐ এলাকায় জলজ ও পরিবেশগত ক্ষতি নিরূপণে একটি বিশেষজ্ঞ দল সুন্দরবন গেছে।

এর আগে বাংলাদেশে সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে ছড়িয়ে পড়া তেল বালতিসহ বিভিন্ন পাত্রের মাধ্যমে সংগ্রহ করার জন্য আশে-পাশের গ্রামগুলোর মানুষ এবং জেলেদের প্রতি আহবান জানানো হয়।

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, এই সংগ্রহ করা তেল রাষ্ট্রীয় একটি তেল সংস্থা প্রতি লিটার ৩০ টাকা করে কিনবে।

প্রশাসন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্থানীয় লোকদের সাহায্যে পুরোনো এই পদ্ধতিতে যতটা সম্ভব হবে তেল সরানোর পর বাকি তেলের কার্যকারিতা নষ্ট করতে নদীতে জাহাজ দিয়ে স্প্রে করা হবে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডুবে যাওয়া ট্যাংকারটিকে তিনদিন পর উদ্ধার করা হলেও নদীতে ৬০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তেল ছড়িয়ে থাকার বিষয়টিই ডলফিনসহ জলজ প্রাণী এবং সুন্দরবনের জন্য বড় সমস্যা হয়ে রয়েছে। ঘটনার তিনদিনের মাথায় তেল ট্যাংকারটিকে উদ্ধার করে নদীর তীরে নেয়া হয়েছে। কিন্তু ট্যাংকারে থাকা সাড়ে তিন লাখ লিটার তেলের সবই শ্যালা নদীতে এবং সুন্দরবনের খালগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে বলে কর্মকর্তারা বলেছেন।

শেষপর্যন্ত এখন গ্রামবাসী এবং জেলেদের উদ্বুদ্ধ করে নদী থেকে তেল সরানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, বনবিভাগ এবং নৌবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাগুলোর বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত এসেছে।

জানা গেছে, গতকাল শুক্রবার ছড়িয়ে পড়া তেল সংগ্রহে নামে জেলে ও স্থানীয় গ্রামবাসীরা। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় চড়ে ঘরের হাঁড়ি-পাতিল আর চটের বস্তা নিয়ে তেল সংগ্রহে নামে গ্রামবাসী।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল কোম্পানির ঠিকাদার তাদের কাছ থেকে ওই তেল কিনে নিচ্ছেন ৩০ টাকা লিটার দরে।

প্রথম পাঁচ ঘণ্টায় এভাবে ৩৪০০ লিটার তেল কেনা হয়েছে বলে পদ্মা অয়েলের ঠিকাদার আবদুল্লাহ ট্রেডার্সের মালিক রফিকুল ইসলাম বাবুল জানিয়েছেন।

বন বিভাগের সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের চাঁদপাই স্টেশন কর্মকর্তা জানান, আগের দিনের ঘোষণা অনুযায়ী, স্থানীয় প্রশাসন ও বনবিভাগের তত্ত্বাবধানে শুক্রবার ১২ ডিসেম্বর সকাল ৮টা থেকে তেল সংগ্রহের কাজ শুরু হয়।

শেলা নদীর জয়মনি থেকে আন্ধারমানিক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিভিন্ন খালে এই কাজ চলছে বলে সহকারী বন সংরক্ষক বেলায়েত হোসেন জানান।

তিনি বলেন, সবাই স্বতস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছে। অনেক পরিবারের নারী ও শিশুরাও হাঁড়ি পাতিল নিয়ে এ কাজে নেমে পড়েছে।

তেল সরানোর এই পুরো কাজ তদারক করছে বনবিভাগ, বিআইডব্লিউটিএ, কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশ ও মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ।

তেল যাতে আরো ছড়াতে না পারে সেজন্য জেলেদের সহায়তায় বনরক্ষীরা বুধবার ১০ ডিসেম্বর থেকেই দুর্ঘটনাস্থলের কাছে শেলা নদীর খালগুলোর মুখ জাল দিয়ে আটকে দেওয়ার কাজ শুরু করেন।

প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালা নদীতে মালবাহী জাহাজের ধাক্কায় ‘ওটি সাউদার্ন স্টার সেভেন’ নামে একটি তেলবাহী ট্যাংকার ডুবে যায়। এঘটনায় নদীর উপর ফার্নেস তেলের ভারী আস্তরণ জমা পড়ায় পানিতে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন প্রবাহে বাধার সৃষ্টি হয়। ফলে এই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনের জীববৈচিত্র এখন মারাত্মক হুমকির মুখে পতিত হয়েছে। শুধু শ্যালা নদীই নয়, এ নদীর শাখা প্রশাখা দিয়ে এসব ফার্নেস তেল ছড়িয়ে পড়েছে সুন্দরবনের আরো গভীরে। সুন্দরবনের যে অংশে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে, সে অঞ্চল সরকার ঘোষিত ডলফিনের অভয়ারণ্য। ট্যাংকারের তেল ছড়িয়ে পড়ায় এসব বিলুপ্তপ্রায় ডলফিনও মরতে শুরু করেছে। সুন্দরবন ও এর আশপাশের জেলেদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা বিভিন্ন নদীতে মাছ ভাসতে দেখেছেন।

নদীতে তেল ছড়িয়ে পড়ায় শুধু বিলুপ্তপ্রায় ডলফিনই নয় বরং বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই শ্বাসমূলীয় বনের গাছপালা, মাছ ও বন্য প্রাণীর জন্য এক মহাবিপর্যয়ে পড়েছে। কারণ পানিতে তেলের আস্তরণ প্রাণের অস্তিত্বের জন্য বিরাট হুমকি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, দুর্ঘটনার পর ১২ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কিছু জানতেন না। জাহাজ উদ্ধার ও তেল অপসারণের কোনো উদ্যোগও নেওয়া হয়নি।

ইতোমধ্যে তেলবাহী ট্যাংকারডুবির ঘটনা ওই অঞ্চলের পানিসহ বনাঞ্চলের প্রাণীদের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠন ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি। তাদের উদ্বেগানুযায়ী, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়লে তা সুন্দরবনের ঐতিহ্যের খেতাবের ক্ষেত্রে মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দেবে।

এর আগে দুর্ঘটনাকবলিত ট্যাংকারের সুপারভাইজার ওয়ালিউল্লাহ জানিয়েছেন, সংকেতের তোয়াক্কা না করে পরিকল্পিতভাবেই এমভি সাউদার্ন স্টার-৭ ট্যাংকারে ধাক্কা দেয় এমভি টোটাল ট্যাংকার।

তিনি জানান, সোমবার বিকেল ৪টার দিকে জয়মনি ঘোল থেকে ট্যাংকারটি রওয়ানা দেয়। ঘন কুয়াশার কারণে ট্যাংকারটি মঙ্গলবার রাতে নোঙর করে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন তিনি আরেকটি ট্যাংকার আসতে দেখেন। ওই ট্যাংকারকে বেশ কয়েকবার সংকেত দেওয়া হয়। কিন্তু সংকেতের তোয়াক্কা না করে পরিকল্পিতভাবেই ধাক্কা দেয় এমভি টোটাল। ট্যাংকার ডুবে যাওয়ার পর প্রশাসনকে জানান হয়। কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

জানা গেছে, সুন্দরবনে ডুবে যাওয়া তেলবাহী জাহাজ ‘ওটি সাউদার্ন স্টার-৭’ সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরে নিবন্ধিত না। এটির লাইসেন্স দিয়েছে পেট্রোবাংলা।

সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালক কমোডর জাকিউর রহমান ভুঁইয়া এ তথ্য জানিয়ে বলেন, সমুদ্র পথে তেল পরিবহনের জন্য যে ধরনের ক্র্যাইটেরিয়া (উপযোগিতা) থাকার কথা, তা এ জাহাজে ছিল না। তা ছাড়া এগুলো অভ্যন্তরীণ নদীপথে তেল পরিবহন করার জন্য, যা ডিপো থেকে সরাসরি গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়। তেলবাহী জাহাজের জন্য যে ধরনের স্ট্যান্ডার্ড থাকার কথা তা এই জাহাজে নেই। এ জাহাজের লাইসেন্স তারা দেননি। ২০১০ সালে কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য পেট্রোবাংলা এ সব জাহাজের লাইসেন্স দেয়। সে সময় থেকে এ জাহাজগুলো তেল পরিবহন করে আসছে।

Facebook Comments