বিএনপির মেয়র হলে বরখাস্ত, আওয়ামী লীগ হলে মন্ত্রী!

0
36
Print Friendly, PDF & Email
1431102108

আওয়ামী লীগের মেয়র হলে মন্ত্রীর মর্যাদা! বিএনপির হলে বরখাস্ত? রাজনৈতিক কারণে বরখাস্ত বা মন্ত্রীর মর্যাদা কাম্য নয়। মানুষের চাওয়া নাগরিকসেবা। মেয়রদের প্রতিশ্রুতি পূরণ। আর সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য প্রয়োজন নির্বাচিত মেয়রের হাতে অবাধ ক্ষমতা দেয়া।
সেবা সংস্থাগুলো মেয়রের অধীনে দিয়ে মেট্রোপলিটন গভর্নমেন্টের যে প্রস্তাব ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম মোহাম্মদ হানিফ করেছিলেন সময়ের ধারাবাহিকতায় পোড় খাওয়া অভিজ্ঞতা নিয়ে চট্টগ্রামের তিনবারের নির্বাচিত মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীও বলেছিলেন, সিটি গভর্নমেন্টের বিকল্প নেই। এমনকি ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও মেয়র সাদেক হোসেন খোকাও একই কথার প্রতিধ্বনি করেছিলেন।
কিন্তু রাজনৈতিক সরকার স্থানীয় সরকারকে অবাধ ক্ষমতা দেয়ার কথা বললেও সিটি মেয়র থেকে পৌর মেয়র, উপজেলা ও ইউপি চেয়ারম্যানদের ওপর আমলাতন্ত্রের খড়গ নামিয়ে মূলত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে চলেছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যানরা তাদের প্রাপ্য ক্ষমতা পাওয়া দূরে থাক উল্টো মামলার খড়গে পড়ে বরখাস্ত হচ্ছেন। জনগণের ক্ষমতায়ন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে নিরঙ্কুশ না করে কখনোই নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আইন ও জবাদিহিতার ঊর্ধ্বে কেউ নন।
চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী বিএনপি সরকারকে বলেছিলেন, আমাকে বরাদ্দ দেয়ার দরকার নেই, আমার প্রজেক্ট অনুমোদন দিন। আমি সিটি কর্পোরেশনের আয় বাড়িয়ে ব্যয় করব। তার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
সম্প্রতি বিতর্কিত তিন সিটি নির্বাচনে ঢাকা উত্তরের নির্বাচিত মেয়র আনিসুল হক বলেছিলেন, সরকারের টাকা না নিয়ে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে চান। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন তার বাবার চেয়ারে বসেই বলেছেন, তার আদর্শ বাস্তবায়ন করবেন। অবিভক্ত ঢাকায় হানিফের মতো জনপ্রিয়তা নিয়ে আর কোনো মেয়র আসেননি। তার সিটি গভর্নমেন্ট না হওয়ার কারণে তিনি নিজেই তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি। সাঈদ খোকন কিভাবে পারবেন সেটা দেখার বিষয়।
চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মঞ্জুর আলম জলাবদ্ধতার অভিযোগে তার গুরুকে ব্যালটে পরাজিত করে মেয়র হয়েছিলেন। তিনিও জলাবদ্ধতা থেকে চট্টগ্রাম নগরীকে মুক্তি দিতে পারেননি। নির্বাচিত মেয়র আ জ ম নাছির জলাবদ্ধতাকেই টপ প্রায়োরিটি দিয়ে পরিচ্ছন্ন নগরীর কথা বলেছেন। মেয়ররা যদি অন্যান্য দেশের মেয়রদের মতো ক্ষমতা না পান তাহলে যানজট, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, ছিনতাই, হকার, অবর্জনামুক্ত ফুটপাত ও পরিচ্ছন্ন শান্তির নগরী আদৌ উপহার দিতে পারবেন কি না। জলাবদ্ধতা থেকে বর্ষাকালে নগরবাসীর দর্ভোগ লাঘব করতে পারবেন কি না এ নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
এদিকে ঢাকার দুটিসহ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে সম্প্রতি বিজয়ী তিন মেয়রকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী মর্যাদা দেয়ার আলোচনা জোরেশোরে বইছে। এই তিনটি নির্বাচন বিএনপির বর্জন, কেন্দ্র দখল, ভোট জালিয়াতি ও ছাপ্পা ভোটের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ। অথচ এই তিনজন মেয়র আওয়ামী লীগের হওয়ার কারণেই কি মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী দেয়ার প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট, খুলনা, গাজীপুরে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থীরা বিএনপির প্রার্থীদের কাছে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। তার আগে চট্টগ্রামে মহিউদ্দিন চৌধুরীর মতো হেভিওয়েট প্রার্থীকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছিলেন বিএনপির মঞ্জুর আলম। নারায়ণগঞ্জ মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সেলিনা হায়াত আইভী বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। তখনও মেয়রদের মর্যাদা আগের মতো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
একসময়ে ঢাকার মেয়রদের মন্ত্রীর মর্যাদা ও অন্যান্য বিভাগীয় মেয়রদের প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় গাড়িতে পতাকা উড়তে দেয়া হয়েছিল। বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ের পর তারা আগের মর্যাদা চাইলেও তা পাননি। বর্তমানে সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী প্রতিথযশা ব্যক্তিত্ব সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের মামলায় এখন কারাবন্দি। মেয়র পদ থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। রিমান্ডের মুখোমখি হচ্ছেন গাজীপুরের মেয়র। তাকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। মামলায়-মামলায় পলাতক অবস্থায় রাজশাহীর মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। ব্যালট বিপ্লবে অভিশিক্ত হলেও সর্বশেষ তিনি বরখাস্ত। খুলনার মেয়র বেশিরভাগ সময় ঢাকায় হাসপাতালে কাটান। বরিশালের মেয়র মানিয়ে চলছেন। আইনি লড়াই ও জনগণই তাদের ভবিষ্যৎ ভাগ্য নির্ধারণ করবে। এসব মেয়র ছাড়াও অনেক পৌরসভা ও উপজেলায় বিএনপি দলীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বরখাস্ত হয়েছেন।
রাজনীতিতে মেয়র পদ থেকে বরখাস্তের নতুন ধারা তৈরি হয়েছে। মেয়ররা সাধারণত সংসদীয় এলাকার চেয়ে বড় এলাকার ভোটারদের ভোটেই বিজয়ী হন। মন্ত্রী হতে গেলে একটি নির্বাচনী এলাকা থেকে এমপি হতে হয়। না হলেও টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রী হওয়া যায়। মেয়রের মর্যাদা মন্ত্রীর সমান না নিচে না উপরে হবে এ ধরনের কোনো রেকর্ড নাকি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে নেই।
কেবিনেট সচিবও প্রধানমন্ত্রীর নজরে এনেছেন বিষয়টি। অবাধ নির্বাচনে বিজয়ী সেলিনা হায়াত আইভী তার ফ্লাগ কার ব্যবহার করছেন। এ নিয়েও সরকারের কোনো বক্তব্য নেই। অবাধ ব্যালট বিপ্লবে বিজয়ী মেয়ররা যেখানে প্রাপ্য মর্যাদার বদলে বরখাস্ত হচ্ছেন সেখানে বিতর্কিত নির্বাচনের গ্লানি নিয়ে বিজয়ী মেয়ররা মন্ত্রীর মর্যাদা পেলে সমালোচকরা বলতেই পারেন বিএনপি হলে বরখাস্ত আওয়ামী লীগের মেয়র হলে মন্ত্রীর মর্যাদা! তবে মেয়রদের মর্যাদা কী হবে সে বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি।

প্রকাশিতঃ মানবকন্ঠ

Facebook Comments