সীমান্তের বাতাসে লাশের গন্ধ

0
51
Print Friendly, PDF & Email

তুমব্রু থেকে উত্তর দিকে চলে গেছে বাইশফাঁড়ি সড়ক। সড়ক দিয়ে কিছু দূর যেতে না যেতেই পাওয়া গেল পচা লাশের গন্ধ। একটু সামনে গিয়েই দেখা গেল মানুষের জটলা। তাদের সাথে কথা বলে জানা গেল ওই স্থানে লাশ অর্থাৎ সীমান্তের জিরো পয়েন্টের ‘মক্কুর টেইলা’ নামক স্থানে মাছি ভনভন করছে।

বিজিবি পুলিশ একসাথে গিয়ে দেখলে মাটির এক ফুট নিচে এক রোহিঙ্গা হতভাগার লাশ। পরে বিজিব সদস্যরা উপরে আরো মাটি চাপা দিলো লাশটি। এভাবে জিরো পয়েন্টের এখানে সেখানে অনেক লাশ মাটি চাপা দেয়া হয়েছে। ফলে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

ঘুনধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, বুধবার রাতেও তুমব্রু খাল থেকে এক রোহিঙ্গার লাশ পাওয়া গেছে। নৌকাডুবিতে রোহিঙ্গাদের প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছেই। বৃহস্পতিবার উদ্ধার হয়েছে আরো ৯টি লাশ। প্রতিদিন ভেসে আসছে লাশ। তাই সীমান্তের বাতাসে এখন লাশের গন্ধ। এদিকে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য বিজিবির ডাকে সাড়া দিচ্ছে না মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বিজিপি। একেবারে নীরব ভূমিকায় রয়েছে তারা।

বিজিবি ৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্ণেল মনজুরুল আহসান খান জানান, ২৫ আগস্টের পর থেকে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য বিবিজি’র পক্ষ থেকে বিজিপিকে অনেকবার ম্যাসেজ পাঠানো হয়েছে কিন্তু কোনো যোগাযোগই করছে না তারা।

এদিকে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ, সমালোচনা ও নিন্দার মাঝেও মিয়ানমারের রাখাইনে মুসলিম জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা নিশ্চিহ্ন করার অভিযান (অপারেশন চোয়াব) চালাচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা। নৃশংস কায়দায় হত্যা, ধর্ষণ এবং বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা চলছে প্রতি মুহূর্তে। মঙ্গলবার রাতে এবং বুধবারও সীমান্তের অনেক স্থানে আগুনের লেলিহান শিখা ও কালো ধোঁয়ার কুন্ডলি দেখা গেছে। থেমে থেমে শুনা যাচ্ছে গুলির শব্দ।

সীমান্ত এলাকা পালংখালী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোজাফ্ফর আহমদ ও ঘুনধুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীর আজিজ জানান, সীমান্তের ওপারে বাড়ি-ঘরে আগুন দেয়ার দৃশ্য এপার থেকে দেখা যাচ্ছে এখনো। সীমান্ত পেরিয়ে রোহিঙ্গাদের ঢল অব্যাহত রয়েছে। পথে পথে অনেকে মৃত্যুবরণ করছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আরাকানে আর কোনো রোহিঙ্গা খুঁজে পাওয়া যাবে না। আরাকানে যাতে একজন রোহিঙ্গাও অবস্থান করতে না পারে সেই মিশন নিয়ে দিনরাত নারকীয় অভিযান চালাচ্ছে মিয়ানমার সেনারা।

বুধবার সকালে তুমব্রু সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় দেখা হয় নাপ্পুরা কাচারবিল এলাকার ফরিদ উল্লাহর (৫৩) সাথে। স্ত্রী পুত্রসহ পরিবারের ১১ জন সদস্য নিয়ে তিনি চার দিন পর বাংলাদেশ সীমান্ত পার হতে সক্ষম হন। ‘আমাদের বাড়ি ঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে সেনারা’ ‘আমার মেয়ের জামাইকে ধরে নিয়ে চোখের সামনে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে তারা’ ‘প্রাণ বাঁচাতে পাড়াতে আশ্রয় নিই’ বললেন ফরিদ উল্লাহ।

বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সময় দেখা হয় ফকিরাবাজার এলাকার বয়োবৃদ্ধ নবী হোসেনের (৬৫) সাথে। তিনি জানান, গত সোমবার আমার বাড়িতে আগুন দিয়েছে মিয়ানমার সেনারা। পরিবারের ৭ জন সদস্য নিয়ে পালিয়ে এসেছি। গত কয়েকদিনে পালিয়ে আসা অনেক রোহিঙ্গা জানান, অবস্থা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে- আরাকানে আর কোনো রোহিঙ্গা থাকতে দেবে না মিয়ানমার সেনারা। মংডু শহরের কাছাকাছি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত চারটি গ্রাম সোজাপাড়া, ঢলিয়া পাড়া, নলবনিয়া ও ঘোনার পাড়ায় সোমবার রাতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

এর প্রেক্ষাপটে ওই চার গ্রামের বাসিন্দারা এখন সীমান্ত পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের পাহাড়ে নো ম্যান্স ল্যান্ডের বিভিন্ন পয়েন্টে এবং নাফ নদীর পাশে লাখ লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। ইতোমধ্যেই কয়েক লাখ রোহিঙ্গা চলে এসেছে বাংলাদেশে। এখনো দলে দলে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। নতুন আসা রোহিঙ্গাদের ঠাঁই হচ্ছে না কোথাও। এসব রোহিঙ্গা উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, টেকনাফের লেদা ও শাপলাপুরে স্থান না পাওয়ায় নিয়ন্ত্রণহীন পরিবেশে উখিয়ার কুতুপালং থেকে শুরু করে থাইংখালী পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার এলাকার পাহাড়ে অবস্থান নিয়েছে।

টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উনচিপ্রাংয়ের পশ্চিমের পাহাড়ে গড়ে উঠেছে নতুন এক রোহিঙ্গা বস্তি। সেখানে প্রায় লাখের কাছাকাছি রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। তবে এই বস্তিটি পুরোটাই বিজিবির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এছাড়া টেকনাফ উখিয়ার অলিগলিতে রোহিঙ্গারা আশ্রয়হীনভাবে এদিক সেদিক ছুটছে খাদ্য ও আশ্রয়ের সন্ধানে। মেরিণ ড্রাইভ দিয়েও রোহিঙ্গারা ছুটে যাচ্ছে কক্সবাজার শহরের দিকে। কক্সবাজার শহরতলীর সমিতিপাড়ায়ও দলে দলে রোহিঙ্গা আশ্রয় খোঁজছে। এক মারাত্মক হযবরল অবস্থা।

এমতাবস্থায় নতুন করে আসা রোহিঙ্গা বসতির জন্য ৫০ একর পাহাড়ি এলাকার প্রস্তাবনা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের পক্ষে অতিরিক্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খালেদ মাহমুদ জানান, অনুমতি পেলেই সব রোহিঙ্গাদের ওখানে একত্র করে রাখা হবে। এদিকে আরাকান থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের পর পুনরায় কেউ যেন আর আরাকানে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য সীমান্তে ব্যাপকহারে মাইন পুঁতে রাখছে মিয়ানমার সেনারা। সীমান্তের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র মতে, মিয়ানমারের কথিত ‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী’ কর্তৃক সীমান্ত চকিতে হামলা এবং হতাহতের ঘটনা পরিকল্পিত পুরনো কৌশল। এবারও এরকম একটি হামলার ঘটনা ঘটিয়ে সেনাবাহিনী ‘সন্ত্রাসীদের খোঁজার’ নামে সিভিলিয়ান রোহিঙ্গাদের নির্মুল অভিযান চালাচ্ছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ ও চাপ এবং মুসলিম বিশ্বের নিন্দা অব্যাহত থাকার পরও মিয়ানমার কিছুই পাত্তা দিচ্ছে না। তারা তাদের কাজ অব্যাহত রেখেছে। মিয়ানমারের এই জঘন্য কর্মকান্ডের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান সংবাদ সংস্থা বিবিসিকে বলেছেন, মিয়ানমার দীর্ঘসময় ধরে একলা চলে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক চাপকে তারা খুব বেশি গুরুত্ব দেয় না। নিজস্ব প্রচুর সম্পদ তারা পেয়েছে। চীন তাদের পক্ষে জাতিসংঘে ভেটো দেয়। তাদের যে সামরিক কর্তৃত্ব, ৭০ বছর ধরেই কিন্তু তারা বল প্রয়োগ করে দেশটাকে এক করে রেখেছে।

তবে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে মিয়ানমারকে নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে বলে মনে করেন প্রফেসর শাহীদুজ্জামান। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে ইন্দোনেশিয়া আর তুরস্ক মিলে একটি সামরিক জোট করা যেতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ‘এই কোয়ালিশনের (জোট) মাধ্যমে সরাসরি যদি মিয়ানমারকে হুঁশিয়ারি দেয়া যায় যে, পরিণতি অত্যন্ত শোচনীয় হবে। এই ধরণের চাপ সৃষ্টি করা, সেটা কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক নেতা যারা, তারা এই ভাষাকেই বুঝবে।এই ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষাকে তারা মোটেই গুরুত্ব দেবে না’।

Facebook Comments
শেয়ার করুন