ষোড়শ সংশোধনী ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনা হবে

0
19
Print Friendly, PDF & Email

দশম জাতীয় সংসদের ১৭তম অধিবেশন আজ শুরু হচ্ছে। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বিকাল ৫টায় অধিবেশন বসবে। এর আগে বিকাল ৪টায় কার্য-উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে অধিবেশনের মেয়াদ ঠিক করা হবে। স্পিকার এ বৈঠকেও সভাপতিত্ব করবেন। ২২ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সংসদ অধিবেশন আহ্বান করেন। এটি হবে সংসদের শরৎকালীন অধিবেশন।

অধিবেশনের প্রথমদিনেই সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় এবং এই রায়ে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার পর্যবেক্ষণ ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে। প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি রায়ের বিষয়ে তাদের ভূমিকা কি হবে তা সংসদীয় দলের সভায় ঠিক করবে। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারা কথা বলবে বলে জানিয়েছে। আজ বিকাল ৪টায় বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের সভাপতিত্বে জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের সভা অনুষ্ঠিত হবে।

সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, দুটি বিষয় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা এর ওপর আলোচনায় অংশ নেবেন। সংসদ সচিবালয় সে প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছে। সাধারণত নোটিশ দিয়ে আলোচনার দিন নির্ধারণ করা হতে পারে অথবা নোটিশ ছাড়াই সদস্যরা পয়েন্ট অব অর্ডারে (অনির্ধারিত) এ ইস্যুতে আলোচনায় অংশ নেবেন। অন্যদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনার পাশাপাশি সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা পররাষ্ট্র এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বিবৃতি দাবি করতে পারেন। সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, অধিবেশনের মেয়াদ এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিন হতে পারে।

তবে সংক্ষিপ্ত হলেও এ অধিবেশনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২১ আগস্ট উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের বক্তব্যেও এমন ইঙ্গিত মিলেছে। ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীতে আপিল বিভাগের সব বিচারপতি স্বাধীনভাবে সব মতামত দিতে পেরেছে কিনা আমি জানি না। সে সুযোগটা বোধহয় প্রধান বিচারপতি তাদের দেননি। রায়টা পড়লে অনেক কিছু বোঝা যায়। রায়টা পড়ছি। আরও কিছু বাকি আছে। সেটাও পড়ব। তারপর এটা নিয়ে আমরা অবশ্যই পার্লামেন্টে আলোচনা করব।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শেখ হাসিনার এ বক্তব্যের আলোকেই ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে উত্তাপ ছড়াবে জাতীয় সংসদ। আসন্ন অধিবেশনে এ ইস্যুতে আওয়ামী লীগসহ তাদের শরিক দলগুলোর সদস্যরা আলোচনা করবেন। জাতীয় সংসদকে ইমম্যাচিউরড (অপরিপক্ব) আখ্যায়িত করে আপিল বিভাগের দেয়া রায়ের পর্যবেক্ষণের জবাব দেবেন তারা। এক্ষেত্রে জাতীয় সংসদে একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা।

জানতে চাইলে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা হবে কিনা তা নির্ভর করবে সংসদ সদস্যদের ওপর। তারা যদি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চান তাহলে হবে। আর কোনো বিধিতে এ আলোচনা হবে কিনা, তাও নির্ভর করবে সংসদ সদস্যদের ওপর। কেউ কোনো বিধিতে আলোচনা করতে চাইলে তাকে সে অনুযায়ী নোটিশ দিতে হবে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ এমপি যুগান্তরকে বলেন, এ ইস্যুতে আওয়ামী লীগের অবস্থান পরিষ্কার। আমরা বলেই দিয়েছি, রায়ের পর্যবেক্ষণে যেসব অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তার কারণে বিতর্ক তৈরি হয়েছে তা বাদ দিতে হবে। এজন্য রিভিউ চেয়ে আবেদন করা হবে। ওই রিভিউয়ে সেসব বাদ দিলে জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে তা থেমে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের বিতর্কিত বিষয় নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, সংসদ নিয়ে কটাক্ষ করা হয়েছে- এ বিষয়গুলো রায় না পড়লে তো তারা বুঝতে পারবেন না। তাদের বোঝানোর জন্যই আমরা কথা বলছি। বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই সংসদেও আলোচনা করা হবে। তবে এ আলোচনা কোন প্রক্রিয়ায় হবে তা অধিবেশন চলার সময় ঠিক হবে।

এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়েও বেশ কয়েকজন সিনিয়র সদস্য বক্তব্য রাখবেন বলে জানা গেছে। মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি ও আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরতে তারা সংসদে আলোচনা করবেন। কয়েকজন সিনিয়র সদস্যের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, রোহিঙ্গা ইস্যুটি এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। মিয়ানমার এ ইস্যুতে যে ধরনের ভূমিকা পালন করছে তা সঠিক নয়। আমরা আমাদের সংসদ থেকে তাদের ভূমিকার সমালোচনা করব। তাদের জানাব যে, তারা ভুল পদক্ষেপ নিচ্ছে।

তারা আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৭ সেপ্টেম্বর দলীয় ফোরামে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মিয়ানমার থেকে অনেক রিফিউজি আসছে। ১৯৭৮ সাল থেকে এ রিফিউজি ঢুকছে। রেজিস্টার্ড যা আছে তার থেকে আনরেজিস্টার্ড বেশি। মিয়ানমারে একটা ঘটনা ঘটলে সেখান থেকে লোক চলে আসে। সবচেয়ে মানবেতর অবস্থা নারী ও শিশুরা যেভাবে কষ্ট পাচ্ছে। নৌকাডুবিতে শিশুরা মারা যাচ্ছে। এটা সত্যি খুব কষ্টের। সহ্য করা যায় না। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি তাদের সহযোগিতা করতে।

সভায় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, মিয়ানমার সরকারকেও চাপ দিচ্ছি, তারা তাদের দেশের মানুষ। যারা আমাদের দেশে আছে তাদের যেন ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এরা তাদেরই দেশের নাগরিক। তারা কেন অন্য দেশে রিফিউজি হয়ে থাকবে? কোনো দেশের মানুষ যদি আরেক দেশে রিফিউজি হয়ে থাকে সেই দেশের জন্য এটা সম্মানজনক নয়- এটা মিয়ানমারকে উপলব্ধি করতে হবে। সেখানকার মানুষ যারা আমাদের দেশে চলে এসে আশ্রয় চাচ্ছে তাদের নিরাপত্তা দেয়া উচিত, ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত। তাদের জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করে দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, অনির্ধারিত আলোচনার পাশাপাশি কার্যপ্রণালি বিধির ১৪৬, ১৬৩ বা অন্য কোনো বিধিতে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ নির্দিষ্ট বিধির আলোকে আলোচনায় যেমন সংসদ সদস্যদের সময় নিয়ে কথা বলার সুযোগ থাকে, তেমনি আলোচনার পর হাউস (অধিবেশন) থেকে সিদ্ধান্তও আসার পথ তৈরি হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক আইনমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু যুগান্তরকে বলেন, সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর আদালত রায় দিয়েছেন এবং রায়ের পর্যবেক্ষণে সংসদকে খাটো করা হয়েছে। কাজেই এটি নিয়ে নিশ্চয়ই সংসদে আলোচনা করা হবে। তিনি বলেন, আমরা আমাদের কথা সংসদে তুলে ধরব। সংসদ পরবর্তী করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। সংবিধান সংসদকে সেই ক্ষমতা দিয়েছে।

জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ যুগান্তরকে বলেন, সংসদীয় দলের সভায় বসে তারা এ বিষয়ে করণীয় ঠিক করবেন।

Facebook Comments
শেয়ার করুন