রোহিঙ্গা সংকট থেকে দৃষ্টি সরাতেই সামরিক উসকানি

0
26
Print Friendly, PDF & Email

সামরিক ড্রোন ও হেলিকপ্টারের বারবার আকাশসীমা লঙ্ঘন- কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গা সংকট থেকে বিশ্বের দৃষ্টি সামরিক উত্তেজনার দিকে নেয়ার জন্য দেশটির সরকার এ ধরনের কাজ করছে বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, এমন উসকানির জবাব হিসেবে কূটনৈতিক টেবিলে কড়া প্রতিবাদ অব্যাহত রাখতে হবে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের কোনো সংঘাতে জড়ানো ঠিক হবে না। তবে সামরিক প্রস্তুতি রাখতে হবে। যাতে কোনো হামলা হলে তার উপযুক্ত জবাব দেয়া যায়। কোন ধরনের সামরিক যান কোন প্রেক্ষিতে আকাশসীমা লঙ্ঘন করছে সেদিকে বাংলাদেশকে বিশেষ নজর রাখতে হবে।

গত ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টির পর মিয়ানমারের সামরিক ড্রোন ও হেলিকপ্টার কমপক্ষে ২০ বার বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। বাংলাদেশ সরকার এ পর্যন্ত দুই দফায় মিয়ানমারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে তার প্রতিবাদ জানিয়েছে। মিয়ানমারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত এ সময় বলেছেন, বিষয়টা তিনি তার দেশকে জানাবেন। তারপর সেখান থেকে তথ্য নিয়ে বাংলাদেশকে জানাবেন।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিপস) প্রেসিডেন্ট বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মুনিরুজ্জামান এ বিষয়ে যুগান্তরকে বলেন, ‘মিয়ানমারের সামরিক ড্রোন ও হেলিকপ্টার যেভাবে আকাশসীমা লঙ্ঘন করছে, তা উসকানিমূলক আচরণ। এসব করে তারা বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া দেখতে চায়। এর আগেও তারা সীমান্তে নানা রকমের খোঁচাখুঁচি করেছে। এটা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর চরিত্র। এটার বিরুদ্ধে কূটনৈতিকভাবে শক্ত ভাষায় প্রতিবাদ করা দরকার।’

আকাশসীমা লঙ্ঘন করলে মিয়ানমারের সামরিক যানকে গুলি করে ভূপাতিত করা উচিত কিনা জানতে চাইলে এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, ‘আমি মনে করি, এটা করলে বিষয়টা সংঘাতের দিকে চলে যাবে। আমি এ মুহূর্তে সংঘাতে জড়ানোর পক্ষে না। আমি বলপ্রয়োগের পক্ষে না। রোহিঙ্গা সংকটে কূটনৈতিকভাবে আমরা এখনও শক্ত অবস্থানে নেই। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়া আমাদের বিপক্ষে আছে। ফলে সার্বিক দিক চিন্তা করে কৌশল খুঁজে বের করতে হবে। মিয়ানমার বারবার আকাশসীমা লঙ্ঘন করতে থাকলে প্রতিবাদের ভাষা আরও শক্ত করতে হবে। সংঘাতে যাওয়া ঠিক না। এটা করা হলে কোনো ফল পাওয়া যাবে না।’

মিয়ানমার প্রেসিডেন্টের মুখপাত্রের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের বুঝতে পারা উচিত, সীমান্তের কাছেই সেনাবাহিনী তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাস্তচ্যুত মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছানোর জন্য। শনিবার বিবিসি বাংলা ‘বাংলাদেশ ও মিয়ানমার কূটনৈতিক সম্পর্কে আবারও টানাপোড়েন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তথ্যটি প্রকাশ করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বাংলাদেশের অনেকগুলো সামরিক রাডার এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষেরও রাডার রয়েছে। এসব রাডারে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমারের সামরিক ড্রোন ও হেলিকপ্টারের বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘনের বিষয়টি ধরা পড়েছে। ঈদুল আজহার দিন মিয়ানমারের একটি সামরিক হেলিকপ্টার বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রায় ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত ঢুকে পড়েছিল বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। এরপরও আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। তবে ওই সময় হেলিকপ্টারগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত প্রবেশ করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ইতিমধ্যে বলেছেন, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াবে না বাংলাদেশ। যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়। যুদ্ধ বাংলাদেশের উন্নয়নকে ধ্বংস করবে।

বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ এ ব্যাপারে যুগান্তরকে বলেন, ‘মিয়ানমার চাইছে যেন সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়। এটা হলে রোহিঙ্গা সংকট থেকে দৃষ্টি সামরিক উত্তেজনার দিকে চলে যাবে। বাংলাদেশকে তাই সংযত আচরণ করতে হবে। এ ধরনের আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনা দুই কারণে হতে পারে। প্রথমত, পাইলটরা খুব বেশি প্রশিক্ষিত না হলে ভুলভ্রান্তি করে আমাদের সীমানায় ঢুকে পড়তে পারে। আবার ইচ্ছা করেও ঢুকতে পারে। এখন দেখতে হবে তারা কতটুকু ভেতরে ঢুকেছে। তারা কি জঙ্গি হেলিকপ্টার নাকি ট্রান্সপোর্ট হেলিকপ্টার নিয়ে এসেছে। জঙ্গি হেলিকপ্টার আক্রমণে সক্ষম। আর ট্রান্সপোর্ট হেলিকপ্টার হলে এত গুরুত্বের সঙ্গে নেয়ার কিছু নেই। কারণ সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি একটি কৌশল হতে পারে। ফলে এ মুহূর্তে ব্যাপারটা কূটনৈতিক প্রতিবাদে সীমিত রাখাই ঠিক হবে।’ অবশ্য তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের নিজেদের প্রস্তুতি রাখা ভালো। কোনো হামলা হলে যাতে আমরা উপযুক্ত জবাব দিতে পারি। বাংলাদেশের নিজের থেকে সামরিক পদক্ষেপে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।

মিয়ানমারের উসকানি এবারই প্রথম নয়। ইতিপূর্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী এ দেশটির সমুদ্রসীমা চিহ্নিত করার আগে বিরোধপূর্ণ জলসীমায় রিগ নিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছিল। তখন কূটনৈতিক টেবিলে প্রতিবাদ করে কোনো সুরাহা না হলে নৌবাহিনীর একটি জাহাজ থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়। তখন গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ করে মিয়ানমার রিগ নিয়ে ফিরে যায়। কিছুদিন আগে সীমান্ত এলাকা থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর এক কর্মকর্তাকে ধরে নিয়ে যায় মিয়ানমার। তখনও কূটনৈতিক টেবিলে নানা দেনদরবারের পরও ওই কর্মকর্তাকে ফেরত দিতে চায়নি মিয়ানমার। শেষ পর্যন্ত এর পরিণতি সম্পর্কে মিয়ানমারকে সতর্কবার্তা দিলে ওই কর্মকর্তাকে ফেরত দেয় দেশটি।

বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি অ্যান্ড জেনারেল এভিয়েশন লিমিটেডের সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন সাহাব ইউ আহমেদ বীর উত্তম শনিবার যুগান্তরকে বলেছেন, ‘মিয়ানমারের সামরিক ড্রোন ও হেলিকপ্টার বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের জন্য আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। মিয়ানমার এ প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের অবস্থান এবং সীমান্তে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী মোতায়েন আছে কিনা সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। এগুলো দেখতে এসে মাঝে মধ্যে আকাশসীমা লঙ্ঘন করে। এ জন্য বাংলাদেশ প্রতিবাদ করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসবের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ এখনই কোনো সামরিক পদক্ষেপে যাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘে যাচ্ছেন। এ মুহূর্তে সামরিক পদক্ষেপে গেলে সমস্যাটা আমাদের ওপর চলে আসবে। সে জন্য এ ব্যাপারে দেখেশুনে সুচিন্তিত ব্যবস্থা নেয়া দরকার।’

রোহিঙ্গা সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক উত্তেজনার ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর অবস্থান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। বিশেষ করে চীন সরাসরি মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। যদিও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের নিরাপত্তা অভিযানের নামে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিষয়ে সর্বসম্মত বিবৃতিতে এ সংস্থার স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া বাধা দেয়নি। রাশিয়া অবশ্য বলেছে, রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে। ফলে এটা স্পষ্ট যে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মিয়ানমারের পক্ষেই থাকবে রাশিয়া। সূত্রটি আরও মনে করে, সামরিক উত্তেজনায় প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। রোহিঙ্গা ইস্যুতে এবারের সংকটময় পরিস্থিতির শুরুতে প্রতিবেশী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফরে গিয়ে সুচির সঙ্গে বৈঠক করেন। তখন সুচিকে মোদি জানান, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের পাশেই থাকবে ভারত। কিন্তু সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ টেলিফোনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিশ্চিত করেন যে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত বাংলাদেশের পাশে থাকবে।

নির্ভরযোগ্য একটি কূটনৈতিক সূত্র শনিবার যুগান্তরকে বলেছে, সুষমা স্বরাজ টেলিফোনে প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানেই ভারত বিশ্বাস করে। সুষমা স্বরাজ মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ আশ্বস্ত করেন যে, মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে, বহুপক্ষীয় আলোচনায় এবং রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বাংলাদেশের অবস্থানের পক্ষে থাকবে ভারত। এই টেলিফোন আলোচনার পর অনেকেই মনে করেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ধীরে ধীরে অবস্থান পরিবর্তন করছে এবং মানবতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ কুমার চাকমা এ বিষয়ে যুগান্তরকে বলেন, ‘আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনা কতটা কীভাবে ঘটেছে সেটা আগে জানা দরকার। আমি মিয়ানমারে রাষ্ট্রদূত থাকাকালে একবার খবর বের হয় যে, মিয়ানমারের বিমান বাহিনীর মিগ কক্সবাজারে ঢুকে বিমানবন্দরে অবতরণের চেষ্টা করে। সেখানে নামতে না পেরে চট্টগ্রাম চলে যায়। ওই খবর পাওয়ার পর আমি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি জানতে চাই। মিয়ানমার তাদের সব সামরিক যানের পরিকল্পনার ছক আমাকে দেখায়। তারা বলে, ওই সময় ওই দিকে তাদের কোনো বিমান সেখানে যাওয়ার কোনো সিডিউল নেই। বিষয়টি আমি বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর সদর দফতরে জিজ্ঞাসা করলে রাডারে দেখা যায়, এটি মিয়ানমারের বিমান নয়। আরেকটি ঘটনা আমার রাষ্ট্রদূত থাকাকালে ঘটেছে। মিয়ানমার বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের রাখাইন রাজ্যে নিয়ে গিয়েছিল। ওই সময় হেলিকপ্টারটি পাইলটের ভুলে নাফ নদীতে আমাদের আকাশসীমায় ঢুকেছিল। আমি তখন ঢাকায় জানাই যে, ওটা সামরিক মহড়া নয়। রাষ্ট্রদূতদের বহনকারী হেলিকপ্টার। এবার বারবার যখন আকাশসীমা লঙ্ঘন করছে সেটা প্রকৃতপক্ষে কী, তা জানা দরকার। এটা জানা মোটেও অসম্ভব কিছু নয়। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী এমনকি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের রাডার আছে। সেখানে দেখা যায়, বারবার কেন আকাশসীমা লঙ্ঘন করছে। আর বারবার আকাশসীমা লঙ্ঘন করবে আর আমরা প্রতিবাদ করে যাব- এতে কার্যকর কিছু হবে না।’ তিনি প্রশ্ন রাখেন- ভুলে আকাশসীমা লঙ্ঘন হলে এতবার কেন? বারবার লঙ্ঘন হলে সেটা অবশ্যই বিপজ্জনক হতে পারে।

Facebook Comments
শেয়ার করুন