সমস্ত বিশ্বকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক দিশা দেখানোর জন্য তৈরি হতে হবে আমাদের: প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং

0
27
Print Friendly, PDF & Email

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের চিন্তাকে দলীয় গঠনতন্ত্রে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করেছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি। আধুনিক চীনের রূপকার হিসেবে স্বীকৃত মাও সে তুং-এর পর জি জিনপিং হলেন দ্বিতীয় ব্যক্তি, ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় যাঁর চিন্তাভাবনা দলীয় গঠনতন্ত্রে মতাদর্শের মর্যাদা পেল। মতাদর্শের মর্যাদা পাওয়ায় মাও-এর মতবাদ যেমন মাওবাদ হিসেবে বিবেচিত হয়, জি-এর চিন্তাধারাও বিবেচিত হবে শি-বাদ হিসাবে। দলীয় গঠনতন্ত্রে স্থান পাওয়ার পর মাও-এর সমান্তরালে ক্ষমতাবান হলেন জি। মঙ্গলবার ‘কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলন’-এর শেষ দিনে শি জিনপিংয়ের চিন্তাধারাকে পার্টির গঠনতন্ত্রে স্থান দেয়ার ব্যাপারে ভোটাভুটি হয়। বেজিংয়ের গ্রেট হলে চূড়ান্ত এই অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অংশ নেন কমিউনিস্ট পার্টির ২ হাজার ২০০ প্রতিনিধি। সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবটি পাশ হয়।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টির দাবি, দেশের নাগরিকদের জীবনধারার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন চিন্তাভাবনা হাজির করেছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এর মাধ্যমে দলে ও সরকারে শি নিজের শীর্ষস্থান আরো পোক্ত করলেন বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। বুধবার বেইজিংয়ে শুরু হয়েছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেস। গত কংগ্রেসে দলের শীর্ষ পদে আসা জি দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই রাষ্ট্র এবং সিপিসির বিভিন্ন স্তরে নিজের কর্তৃত্ব জোরদার করেছেন। উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বিশ্বমঞ্চে চীনের এখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নেয়ার সময় বলেও মন্তব্য করেন। কংগ্রেসের শুরুর দিন থেকেই দলটির বেশ ক’জন শীর্ষকর্তা তাঁদের বক্তব্যে ‘শি জিনপিংয়ের চিন্তাভাবনার’ কথা উল্লেখ করেন। মতাদর্শটি কংগ্রেসে গৃহীত হলে সিপিসির গঠনতন্ত্রেও পরিবর্তন আসবে। এর ফলে মাও সে তুং ও দেং জিয়াওপিংয়ের পর শি হবেন দলটির তৃতীয় ‘তাত্ত্বিক নেতা’।

দল ও রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হবেন তিনি। সিপিসির একাধিক শীর্ষকর্তা কংগ্রেসে ‘চীনের চরিত্রের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সমাজতন্ত্র বিষয়ে শি জিনপিংয়ের নতুন যুগের ভাবনা’র প্রশংসা করে বক্তব্য রাখেন। শি’র এই মতাদর্শে ১৪টি নীতি আছে বলে জানিয়েছেন তারা। যেখানে কমিউনিস্ট আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চীনে গভীর ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কার এবং মানুষ ও প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় রেখে উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। এতে সেনাবাহিনীর উপর জনগণের কর্তৃত্বের কথাও বলা হয়েছে।

আফগানিস্তান, ইরাকসহ একাধিক দেশে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে ব্যস্ত আমেরিকা। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত এককালের দাপুটে রাশিয়া। সুনির্দিষ্ট রণকৌশল ও সাহসী পদক্ষেপ নেয়ার অক্ষমতায় ভুগছে ভারতের মতো দেশ। ফলে এই মুহূর্তে একক শক্তির আসন কার্যত শূন্য। এবার এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আমেরিকার আসন টলানোর ছক কষছে চীন। প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য্য, মানব সম্পদ ও বিদ্যুৎ গতিতে দৌড়াতে থাকা অর্থনীতিতে ভর করে এমন পরিকল্পনাই করছেন প্রেসিডেন্ট জিনপিং। এমনটাই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া প্রায় নিশ্চিত। গত বুধবার শীর্ষ নেতৃত্বের সামনে সাড়ে তিন ঘণ্টার দীর্ঘ বক্তৃতা দেন জিনপিং। সেখানে সমাজতান্ত্রিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে কমিউনিস্ট পার্টি পুনর্গঠন করা যায়, সে বিষয়েই অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছেন। একই সঙ্গে চীনাফৌজকে বিশ্বের অন্যতম সেরা সেনাবাহিনী হিসাবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন ৬৪ বছরের এই রাষ্ট্রনায়ক।

জিনপিং বলেন, ‘আমাদের দল, আমাদের নাগরিক, আমাদের বাহিনী ও আমাদের দেশ নজিরবিহীন উন্নতি করেছে। কিন্তু জাতীয় পুনর্গঠনের লক্ষ্যে আমাদের আরও অনেক কাজ করতে হবে। এবার নিজেদের পরিবর্তিত করার সময় এসেছে। সমস্ত বিশ্বকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক দিশা দেখানোর জন্য তৈরি হতে হবে আমাদের।’ রাজনৈতিক মাপকাঠিতে আপাত নিরীহ মনে হলেও, চীনের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে বিশাল পরিকল্পনার আঁচ পাচ্ছেন কুটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। ‘সুপার পাওয়ার’ হিসাবে বিশ্বে নিজের দাপট বাড়ানোর নকশা তৈরি করে ফেলেছে চীন।

২০১২-য় জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ক্রমাগত সামরিক শক্তি বাড়িয়ে চলেছে চীন। বর্তমানে তাদের সামরিক বাজেট প্রায় ১৪ হাজার কোটি ডলার, আমেরিকার পর সর্বোচ্চ। ২০৩৫-এর মধ্যে বাহিনীকে বিশ্বের অন্যতম সেরা করার লক্ষ্য নিয়েছেন জিনপিং। কিন্তু তাতে এশিয়া মহাদেশের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। চীনের সেনা সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টির অধীনে। সেনার হাইকমান্ড হল সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন, যার চেয়ারম্যান স্বয়ং জিনপিং। গত বছর তাঁকে ‘কোর লিডার’ বা সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে মনেনীত করা হয়। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মাও সে তুং এবং তার উত্তরসূরি দেং জিয়াওপিং ছাড়া যে সম্মান কারো ভাগ্যে জোটেনি। কেন্দ্রীয় কমিটিতেও আধিপত্য সুনিশ্চিত করে ফেলেছেন তিনি। একাধারে দলের শীর্ষ নেতা, দেশের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডার হিসাবে উঠে এসেছেন জিনপিং।

Facebook Comments
শেয়ার করুন