জনগণ মুক্তি চায়; পরিবর্তন চায় : দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া

0
121
Print Friendly, PDF & Email

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘আজকে ঘরে ঘরে মানুষের কান্না আর আহাজারি। মানুষ আজকে অত্যাচারিত, নির্যাতিত, নিপীড়িত। তাই এদের (আওয়ামী লীগ) হাত থেকে মানুষ মুক্তি চায়। মানুষ পরিবর্তন চায়। এই পরিবর্তন আসতে হবে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে, ভোটের মধ্য দিয়ে আসতে হবে। এই জন্য মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে’।

আজ রোববার রাজধানীর সোহাওয়ার্দী উদ্যানে ‘মহান জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত মহাসমাবেশের বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রে মত ও পথের পার্থক্য থাকবে। কিন্তু দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে এক হতে হবে। কাজেই আমরা জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছি, আসুন। বহুদলীয় গণতন্ত্রে বহু মত ও পথের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে এক হতে হবে। এই কাজ করলেই জনগণের কল্যাণ, দেশের উন্নতি করা সম্ভব’।

সোহরাওয়ার্দীর সমাবেশকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দলের নেতাকর্মীদের পথে পথে বাধা দেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

সরকারের এই অগণতান্ত্রিক আচরণের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘সমাবেশের অনুমতি দিয়েও পথে পথে আমাদের নেতাকর্মীদের বাধা দেয়া হয়েছে। আমি নিজেও বাধার মুখে এখানে পৌঁছেছি। এদের (আওয়ামী লীগ) এতটাই ছোট মন। এরা যে ছোট মনের তা আজ আবারও প্রমাণ করে দিলো। এত ছোট মন নিয়ে রাজনীতি করা যায় না।’

সমাবেশকে ঘিরে সরকারের অপতৎপরতার কঠোর সমালোচনা করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেন, ‘জনসভা যাতে না হয়, জনগণ যাতে না আসতে পারে তার জন্য বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। হোটেলগুলোতে তল্লাশি চালানো হয়েছে। পাবলিক টান্সপোর্ট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, যাতে জনগণ সমাবেশে আসতে না পারে। বিএনপি যাতে সমাবেশ করতে না পারে।’

সমাবেশে উপস্থিত লাখো নেতাকর্মীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘শুধু কি তাই। শুধু তাই নয়। আপনাদের মতো আমিও বাধার মুখে পড়েছি। আমিও যাতে আপনাদের সামনে পৌঁছাতে না পারি সেজন্য আমার বাড়ির সামনে থেকে গুলশান পর্যন্ত বাস দাঁড় করিয়ে রাস্তা আটকে দেয়া হয়েছে। অথচ বাসের ভেতর ড্রাইভার নেই। এদের (আওয়ামী লীগ) মনমানসিকতা আজ আবারও প্রমাণ হলো জাতির সামনে।’

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, ‘শেখ হাসিনার অধীনে এদেশে কোনও দিন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না। সেটি সম্ভবও নয়। যারা সামান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনেই ভোট চুরি করে জিততে চায় তাদের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের মতো বৃহৎ দায়িত্ব কোন ভাবেই নিরপেক্ষ হতে পারে না।’

এসময় তিনি ইভিএম বাতিলের পাশাপাশি নির্বাচনের মাঠে সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রিয়াল ক্ষমতা দেয়ার জোর দাবি জানান। তিনি নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে বলেন, সরকারের দেখান পথেই নির্বাচন কমিশন চলছে। ইসিকে তার নিরপেক্ষতার প্রমাণ দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বিএনপির রাজনীতিকে জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি আখ্যা দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, ‘জনবিচ্ছন্ন আওয়ামী লীগ ৭ নভেম্বর ও জনগণকে ভয় পায়। তারা অঘোষিত বাকশালকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। যারা এই অপশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলে তাদেরই তুলে নিয়ে গুম করে ফেলা হয়।’

বিরোধী দলের ওপর হামলা-মামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কতজ‌নের না‌মে মিথ্যা মামলা দিবেন? জেলখানা বিএন‌পির লোক‌ দি‌য়ে ভরা। অথচ আজ আওয়ামী লীগের লোকেরা গুম খুন করেও দিন দুপুরে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা ক্ষমাও পে‌য়ে যাচ্ছে। জনগণ ফুঁসে উঠছে। আওয়ামী লীগ‌কে এই গুম, খুন, হত্যার রাজনীতি বন্ধ কর‌তে হ‌বে।’

“বর্তমান সরকার ঘ‌রে ঘ‌রে চাকুরি না দি‌য়ে ঘ‌রে ঘ‌রে বেকার যুবকের সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে। উন্নয়নের না‌মে চল‌ছে লুটপাট। প্রতি প‌দে প‌দে অত্যাচার নির্যাতন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠা‌নে লেখাপড়া নাই”- যোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘১০ টাকার চালের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা এখন মানুষ ৭০ টাকায় কেন কিনবে? মানুষ কিনতে বাধ্য হচ্ছে। সারের মূল্য আমাদের সময় থেকে বর্তমানে ৫গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে’।

বিচার বিভাগ প্রসঙ্গে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, ‘দে‌শে বিচার‌ বিভাগ ব‌লে কিছু নেই। প্রধান বিচারপ‌তি‌কে ছু‌টি‌তে যে‌তে বাধ্য করা হ‌য়ে‌ছে। শুধু তাই নয় তা‌কে পদত্যাগ কর‌তেও বাধ্য করা হ‌য়ে‌ছে। বিদেশে যাওয়ায়র পর এজেন্সির লোক দিয়ে তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। নিম্ন আদালতে বেকসুর খালাস পাওয়া বিএনপি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মামলা কেন উচ্চ আদালতে এনে মিথ্যা রায় দেয়া হলো সেই সমালোচনা করেন তিনি। তিনি নিম্ন আদালতে বেকুসুর খালাস দেয়া সেই বিচারকে দেশছাড়া করার কথা বলে এর সমালোচনা করেন তিনি।

দেশ দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে দাবি করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেন, ‘প্রতিনিয়ত প্রতি প‌দে প‌দে দুর্নী‌তি। দুদুক প‌ড়ে আছে বিএন‌পির পেছ‌নে। অথচ যারা দুর্নী‌তি কর‌ছে তা‌দের দি‌কে চোখ প‌ড়ে না দুদকের। বাংলা‌দেশ ব্যাংক থে‌কে ৮০০ কো‌টি টাকা কারসা‌জি ক‌রে কারা বিদেশে পাচার করেছে দেশবাসী তা জানে। তবু দুদক চুপ হয়ে আছে। জিএফআই এর এক প্রতিবেদনে গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে ৬ লাখ কোটি টাকা পাচারের অনিয়ম প্রকাশ করে। সরকারে লোক টাকা পাচার করে বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ছে’।

সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যত‌দিন ক্ষমতায় থাক‌বে তত‌দিন দেশে গুম খুন হত্যা চলতেই থাকবে। আমরা রাজনী‌তি‌তে গুনগত প‌রিবর্তন চাই, ঐক্যের রাজনী‌তি কর‌তে চাই।’

তিনি বলেন, রোহিংগা সমস্যা সমাধানে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তাই আলোচনার মাধ্যমে এই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করতে হবে মিয়ানমারকে। এবং সেখানে (মিয়ানমারে) যেন তারা নিরাপদে বাস করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে’।

আওয়ামী লীগ ১০ টাকা কেজিতে চাল খাওয়াতে চেয়েছিল উল্লেখ করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেন, ১০টাকার চাল কেন ৭০ টাকায়? সবজির দাম ৭০টাকা কেজির কমে পাওয়া যাচ্ছে না। কেন বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে প্রতিনিয়ত। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রান্সপোর্ট খরচসহ সব কিছুর দাম বেড়ে যায়। একজন রিকশা চালকও বেশি ভাড়া চায়। সারের দাম বেড়েছে। কৃষকের মরার দশা করেছে। সরকার কৃষককে মারার ব্যবস্থা করেছে, সাধারণ মানুষকে মারার ব্যবস্থা করেছে। শ্রমিকদের উপরও নানা রকম অত্যাচার। তাদের মজুরি বৃদ্ধি পায় না।

সামনে উপস্থিত ছাত্র, যুবকদের উদ্দেশ্য করে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, ‘এই ছেলেরা- তারা (সরকার) বলেছিল ঘরে ঘরে চাকরি দেবে। তোমরা কি চাকরি পেয়েছো? ঘরে ঘরে চাকরি না দিয়ে তারা ঘরে ঘরে বেকার সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, শিক্ষিত বেকাররা যাতে চাকরি পায়, তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি দেওয়ার ব্যবস্থা করবো।

তিনি বলেন ‘সরকার উন্নয়নের কথা বলে। উন্নয়নের নামে চলছে লুটপাট। রাস্তা-ব্রিজ তৈরিতে ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় খরচ তিন-চারগুণ বেশি’।

বিএনপি প্রধান আরও বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে, তারপরও বিদ্যুৎ পায় না। এমনকি গুলশানের মতো জায়গাতেও বিদ্যুৎ যায়-আসে। কুইক রেন্টালকে দায় মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের গায়ে হাত দেয়। নির্যাতন করে। নারী নির্যাতন আওয়ামী লীগের আমলে বেড়েছে।

বেলা ২টায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে জনসভা শুরুর হয়। বিকাল ৩.২০ মিনিটে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সমাবেশস্থলে পৌঁছান। এসময় চার দিক থেকে তার নামে স্লোগান ওঠে। তিনি হাত উঁচিয়ে নেতা-কর্মীদের শুভেচ্ছার জবাব দেন।

উক্ত সমাবেশের মূল মঞ্চের পেছনে লাগানো ব্যানারে লেখা ছিল- ‘৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে জনসভা’।

জনসভার জন্য ৬০ ফুট লম্বা ও ৩০ ফুট প্রশস্ত মঞ্চ নির্মাণ করা হয়। মঞ্চের চারপাশে বসানো হয়ে সিসি টিভি ক্যামেরা। মঞ্চের সামনে ৩০ ফুট জায়গায় বেষ্টনি দেওয়া হয়।

পুরো জনসভা সুশৃঙ্খল রাখতে ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের দুই হাজারের বেশি নেতাকর্মীদের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন করা হয়।

জনসভা ঘিরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশ-পাশের এলাকা সাজানো ছিল নানা রঙের ব্যানার-ফেস্টুনে। এসব ডিজিটাল ব্যানারে ছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবি।

অনুষ্ঠানে মূল কেন্দ্র সোহরাওয়ার্দি উদ্যান ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পরে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন, শাহবাগ থেকে মৎস্য ভবন পর্যন্ত। সমাবেশ পরিণত হয় মহাসমাবেশ এবং জনসমুদ্রে।

Facebook Comments
শেয়ার করুন