গাজীপুর-৩ আ. লীগের দুর্গে বিভক্তি বিএনপির বড় ভরসা

0
824
Print Friendly, PDF & Email

আওয়ামী লীগ নেতা রহমত আলী গাজীপুর-৩ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য। নবম সংসদেও তিনি এ এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন। আসন পুনর্বিন্যাসের আগেও তিনি শ্রীপুর নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য ছিলেন। এ কারণে এ এলাকাটি আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু প্রায় এক যুগ ধরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ দুটি অংশে বিভক্ত। ক্ষমতাসীন দলের এই বিভক্তি আসনটি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে এখন বিএনপির জন্য বড় ভরসা।

শ্রীপুর উপজেলা ও গাজীপুর সদর উপজেলার তিন ইউনিয়ন (মির্জাপুর, ভাওয়ালগড়, পিরুজালী) নিয়ে গাজীপুর-৩ আসন, যা সংসদের ১৯৬তম নির্বাচনী এলাকা। বিগত ১০টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ছয়টিতেই এ আসনে জয়লাভ করেছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি দুইবার ও জাতীয় পার্টি দুইবার জয়লাভ করেছে।

১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের টিকিটে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন রহমত আলী। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন বাদে সব কটি নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে তিনিই জয়লাভ করেছেন।

একাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে আলোচনায় থাকা বড় দুই দলের সম্ভাব্য প্রার্থী ১০ জন। সামনে এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য রহমত আলী ছাড়াও আছেন অন্তত চারজন নেতা। বিএনপির পাঁচজন ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) একজন প্রচারে রয়েছেন।

আওয়ামী লীগ : ২০০৬ সালের পর থেকে দলের ভেতর বিভক্তি প্রকাশ্য রূপ নেয়। এক পক্ষে রয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য রহমত আলী ও তাঁর ছেলে দলের কেন্দ্রীয় নেতা জামিল হাসান দুর্জয়। দলের আরেকটি অংশের নেতৃত্ব দেন গাজীপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন সবুজ।

বার্ধক্যজনিত কারণে প্রায় দেড় বছর ধরে রহমত আলী অসুস্থ। এ অবস্থায়ও দলের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে সরব তিনি। এ ছাড়া প্রায় দুই যুগ ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় রহমত আলীর ছেলে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাবেক বাণিজ্যবিষয়ক সহসম্পাদক জামিল হাসান দুর্জয়। দীর্ঘদিন ধরেই মাঠ গুছিয়েছেন তিনি। তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করাসহ দলের কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার কৌশল নিয়ে তিনি এগিয়েছেন। বর্তমানে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। এর আগে দীর্ঘদিন তিনি শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। এবার দল থেকে তাঁকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে বলে আশাবাদী আওয়ামী লীগের একটি অংশ। অবশ্য দলের আরেকটি অংশের মধ্যে প্রচার রয়েছে, ইকবাল হোসেন সবুজ মনোনয়ন পেতে পারেন।

রহমত আলীর ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, নেতাকর্মীদের চেয়ে তাঁর কাছে সাধারণ মানুষের মূল্যায়ন বেশি। ফলে কখনোই তাঁকে পরাজয়ের গ্লানি ছুঁতে পারেনি। তাঁর পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে পর পর পাঁচবার তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর জয়ের ব্যবধান বেড়েছে প্রতিটি নির্বাচনেই। তবে এবার তিনি মনোনয়ন চাইবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। প্রতিটি অনুষ্ঠানেই তাঁর ছেলের জন্য দোয়া আর সমর্থন চান তিনি।

রহমত আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভারতের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মাস্টার্স করে দেশে ফিরে আমার ছোট ছেলে জামিল হাসান দুর্জয় দলের প্রাথমিক সদস্য হয়। এরপর নিষ্ক্রিয় থাকা দলের প্রবীণ নেতাকর্মীদের ফের সক্রিয় করে সে (দুর্জয়)। পাশাপাশি তরুণ মেধাবীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বাড়ায়। ফলে তার হাত ধরে তৈরি হয় হাজারো নেতাকর্মী।’ মনোনয়নের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমার নেত্রী (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) ওই সিদ্ধান্ত দেবেন। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) মানুষের জন্য, দলের জন্য যা ভালো, তা-ই করবেন।’

জামিল হাসান দুর্জয়ের ঘনিষ্ঠজনরা বলেন, বর্তমানে তাঁর নেতৃত্বে উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশসহ পৌর, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে দল, এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো একাট্টা। তাঁর নির্বাচনী এলাকার প্রতিটা গ্রাম-মহল্লায় গিয়েছেন তিনি। তাঁর বাবার পর তিনি দলের প্রার্থী হবেন, এ লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছেন। গত বছরের ৭ নভেম্বর থেকে নির্বাচনী এলাকায় ‘ভোটকেন্দ্রভিত্তিক’ এক হাজার ২০০ তৃণমূল উন্নয়নসভা হয়েছে তাঁরই নেতৃত্বে। ওই উন্নয়নসভা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

জামিল হাসান দুর্জয় বলেন, ‘শিশু বয়সে বাবার মুখে বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনে বড় হয়েছি। কৈশোরে যখন বুঝতে শিখেছি; তখন থেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আমার বুকে। তখন থেকেই আমার একমাত্র স্বপ্ন, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রাজনীতি করার। ওই স্বপ্ন নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় আগে তৃণমূল রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছি।’

স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশের দাবি, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকাকালে দলের শত শত নেতাকর্মী নির্যাতিত হয়। সাজানো মামলার শিকার হয় অসংখ্য নেতাকর্মী। ওই সময় ইকবাল হোসেন সবুজ মামলায় জেরবার নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ান। ফলে শ্রীপুরের রাজনীতিতে তাঁরও অনুসারী তৈরি হয়। ২০০৬ সালে দলের মনোনয়ন দাবি করেন তিনি। এতে রহমত আলীর সঙ্গে বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়।

ইকবাল হোসেন সবুজ বলেন, ‘মনোনয়নের জন্যই নয়, আমি সাংগঠনিক কাজ করছি। আমি সব সময় সাধারণ মানুষসহ নেতাকর্মীদের সঙ্গেই আছি।’

এরই মধ্যে ইকবাল হোসেন সবুজের নেতৃত্বে বিভিন্ন এলাকায় ‘উঠান বৈঠক’ করে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হচ্ছে বলে তাঁর অনুসারীরা জানায়।

দল থেকে এবার মনোনয়ন চাইবেন আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হারিছ উদ্দিন আহমেদ। গত সংসদ নির্বাচন ছাড়া এর আগে অনুষ্ঠিত প্রায় সব নির্বাচনেই মনোনয়ন চেয়েছেন এই মুক্তিযোদ্ধা। গাজীপুর জজ কোর্টের বর্তমান সরকারি কৌঁসুলি (পাবলিক প্রসিকিউটর) হারিছ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এবার আশা করছি, দল আমাকে মনোনয়ন দেবে।’

এ ছাড়া গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবু আক্তার হোসেন খান বুলু মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে এরই মধ্যে সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘দল আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করব।’

বিএনপি : গাজীপুর-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যাও কম নয়। এ তালিকায় আছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহস্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ও ড্যাবের যুগ্ম সম্পাদক ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা এস এম রুহুল আমীন, গাজীপুর জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও শ্রীপুর উপজেলা শাখার সভাপতি শাহজাহান ফকির, জেলা শাখার যুগ্ম সম্পাদক সাখাওয়াৎ হোসেন সবুজ, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার ফজলুল করিম মণ্ডল জুয়েল। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরেই মাঠ গোছাচ্ছেন, যোগাযোগ রাখছেন নেতাকর্মীদের সঙ্গে। তাঁদের অনেকেই কেন্দ্রের ‘সবুজ সংকেত’ পেয়েছেন বলেও দাবি করেন।

১৯৭৯ ও ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছাড়া জয়ের মুখ দেখেনি বিএনপি। ওই দুটি নির্বাচনে বিএনপির সাবেক স্থায়ী কমিটির সদস্য চৌধুরী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী নির্বাচিত হন। বিগত ২০০৯ সালের ৯ মার্চ সংবাদ সম্মেলনে দলের চেয়ারপারসন নিয়ে মন্তব্য করেন তানভীর আহমেদ সিদ্দিকীর ছেলে ইরাদ আহমেদ সিদ্দিকী। এর জের হিসেবে ওই বছরের ১৭ মার্চ দল থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি। এর পর থেকেই এ এলাকায় নেতাকর্মীরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। বহুধা বিভক্ত হয়ে পড়ে দল।

কেন্দ্র থেকে মাঠ গোছানোর নির্দেশ পেয়েছেন বলে দাবি করেন ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু। তিনি এ আসনটিকে আওয়ামী লীগের দুর্গ মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘এ নির্বাচনী এলাকার মধ্যে শ্রীপুরে ভোটার অনেক। কিন্তু শ্রীপুর থেকে বিএনপি কখনোই প্রার্থী দেয়নি। আর শ্রীপুরের মানুষও উপজেলার বাইরে ভোট দেয়নি। শ্রীপুর থেকে প্রার্থী দিলে অনেক আগেই পুনরুদ্ধার হতো আসনটি।’ আগামী নির্বাচনে তিনি বিএনপির মনোনয়ন পাবেন বলে আশা প্রকাশ করে রফিকুল ইসলাম।

মাওলানা রুহুল আমীনও দাবি করেন তিনি কেন্দ্র থেকে ‘সবুজ সংকেত’ পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি শ্রীপুর উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। টানা ১৪ বছর ওই পদে থেকে উপজেলাজুড়ে কর্মী সৃষ্টি করেছি। আমি দল থেকে কিছুই নিইনি। এবার দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে বলে আশা করছি।’

অন্যদিকে দলে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন শাহজাহান ফকির। দীর্ঘদিন ধরে তিনি শ্রীপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি থাকায় উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে দল তাঁরই নেতৃত্বে চলছে। এ সরকারের আমলে আন্দোলনের কারণে মামলার আসামি হয়ে জেল খেটেছেন তিনি।

শাহজাহান ফকির বলেন, ‘কেন্দ্র মাঠ জরিপ চালিয়ে প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। আর সেটা হলে আমাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে।’

বিএনপির আরেক শক্তিশালী মনোনয়নপ্রত্যাশী সাখাওয়াৎ হোসেন সবুজ। তিনিও সরকারবিরোধী আন্দোলনের কারণে মামলা জড়িয়ে দুইবার জেল খেটেছেন। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ৯টি মামলা রয়েছে।

সাখাওয়াৎ হোসেন বলেন, ‘বিএনপির চরম দুঃসময়ে রাজপথে থেকেছি। নানা আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে দলকে সুসংগঠিত করার জন্য ছাত্রজীবন থেকেই কাজ করছি।’ দল তাঁকে মনোনয়ন দেবে বলে প্রত্যাশা করছেন তিনি। অন্যদিকে অনেক আগেই মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে ঘোষণা দিয়ে মাঠে নেমেছেন ব্যারিস্টার ফজলুল করিম মণ্ডল জুয়েল। তিনি বলেন, ‘এ সরকারের আমলে বিএনপির যেসব নেতাকর্মী বিভিন্ন মামলার আসামি হয়েছে, আমি তাদের অনেকের পাশে দাঁড়িয়েছি।’

জাসদ : গাজীপুর জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক মো. জহিরুল হক মণ্ডল বাচ্চু মহাজোট থেকে মনোনয়নের জন্য কেন্দ্রে যোগাযোগ করছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সব প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে কাজ করছি।’

প্রকাশিতঃ কালের কন্ঠ

Facebook Comments
শেয়ার করুন